Titas River - Part 1 in Bengali Love Stories by Projapoti books and stories PDF | তিতাস নদী - পর্ব 1

Featured Books
Categories
Share

তিতাস নদী - পর্ব 1

ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের গ্লাসটা সবেমাত্র ঠোঁটে ছুঁইয়েছেন মদন কাকা, ঠিক সেই মুহূর্তে কাউন্টারের ওপর সজোরে একটা থাপ্পড় পড়ার শব্দে কেঁপে ওঠে চারপাশ।

"কী কাকা? কালকের কথাটা মনে আছে, নাকি বয়সের দোষে ভুলে মেরে দিয়েছ?" পাড়ার বখাটে ছেলে রতনের কর্কশ গলার আওয়াজে চায়ের দোকানের বাকি দু-তিনজন খদ্দেরও চমকে ওঠে। এমনকি বেঞ্চের নিচে শুয়ে থাকা কুকুরটাও কান খাড়া করে উঠে বসে।

মদন কাকা ভয়ে ভয়ে হাত জোড় করেন। "বাবা রতন, বিশ্বাস কর, এই ক'দিনে বেচাকেনা একদম নেই। মেয়ের ওষুধের টাকাটা জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছি। আমাকে আর ক'টা দিন সময় দে বাবা।"

রতন দাঁত খিঁচিয়ে ওঠে। "তোর মেয়ের ওষুধ কেনার জন্য আমাদের ক্লাবের কাজ আটকে থাকবে নাকি? সোজা কথায় টাকাটা বের কর, নাহলে আজ তোর এই চায়ের দোকান আমি রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলব!"

রতন চায়ের কেটলিটার দিকে হাত বাড়াতে হঠাৎ পেছন থেকে একটা শক্ত হাত ওর কলারটা খপ করে চেপে ধরে। হাতটার বাঁধন এতটা শক্ত যে রতনের মনে হয় ওর দম আটকে আসছে।

"দোকান ভাঙবি?! কিন্তু তার আগে তোর হাত দুটো যদি আমি ভেঙে গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দিই, সেটা কেমন হবে রতন?"

হিমশীতল গলাটা কানে যেতে রতনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। কাঁপা কাঁপা গলায় সে পেছনে না ঘুরে বলে ওঠে, "রু... রুদ্র দা!"

রুদ্র এক ঝটকায় রতনকে নিজের দিকে ঘোরায়। দুজনের চোখাচোখি হয়। রুদ্রর চোখের দৃষ্টির তেজে রতন সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নেয়। ঘাড় বেয়ে ঘামের ফোঁটা টপ টপ করে ঝরে পড়ে। ভয়ে গোটা শরীর শিটিয়ে আসে। কারণ...

রুদ্রর চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকার সাহস খুব কম মানুষের আছে। ছ'ফুটের বেশি লম্বা শরীর। প্রশস্ত কাঁধ। গাঢ় নীল শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। হাতের মোটা মোটা শিরাগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
তবে মুখে কোনো রাগ নেই। আর সেটাই সবচেয়ে ভয়ের। কারণ সবাই জানে, রুদ্র যত শান্ত থাকে...
সে ততটাই বিপজ্জনক।

"তোর সাহস তো কম নয় রতন! তোদের ক্লাবের প্রেসিডেন্ট কে রে? আমি, তাই তো? আমি কি তোকে বলেছিলাম এই গরিব মানুষগুলোর পেট মেরে চাঁদা তুলতে? নাকি পাড়ায় তোলাবাজি শুরু করেছিস?" রুদ্র নিচু গলায় কথাগুলো বললেও রতনের বুঝতে বাকি থাকে না, আজ তার শেষ দিন। বাহানা দিয়ে না বেরোতে পারলে আজ নির্ঘাত তার মরণ আছে।

"না না রুদ্র দা! ভুল হয়ে গেছে। আমি আসলে..." রতন তোতরাতে শুরু করে।

"চুপ!" রুদ্র গর্জে ওঠে। "কাল মদন কাকার কাছ থেকে যে পাঁচশো টাকাটা জোর করে নিয়েছিলি, সেটা কাউন্টারে রাখ। এক্ষুনি!"

রতন আর কোনো কথা না বলে পকেট থেকে টাকাটা বের করে কাউন্টারে রেখে দেয়।

"এবার এখান থেকে দূর হ। আর কোনোদিন যদি এই পাড়ার কোনো নিরীহ মানুষের ওপর দাদাগিরি করতে দেখি, তবে নিজের পায়ে হেঁটে আর বাড়ি ফিরতে পারবি না। মনে থাকে যেন!" রতন মাথা নেড়ে কার্যত দৌড় লাগায় সেখান থেকে।


দোকানের পরিবেশটা মুহূর্তের মধ্যে একদম শান্ত হয়ে যায়। আশেপাশের লোকেরা হাফ ছেড়ে বাঁচে। রুদ্র এবার মদন কাকার দিকে ঘোরে। শার্টের হাতাটা ঠিক করে রুদ্র একটা বেঞ্চ টেনে বসে পড়ে। মদন কাকার দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে বলে, "কাকা, এক কাপ চা দাও তো। মাথাটা বড্ড ধরেছে।"

মদন কাকা চোখ মুছতে মুছতে চা বানাতে যান। "তুই না থাকলে যে আজ কী হত রুদ্র! তুই আমাকে বাঁচিয়ে দিলি বাবা।"

রুদ্র একটু বিরক্ত হয়ে বলে, "আহ কাকা, তুমি আবার ঘ্যানঘ্যান শুরু করলে! তোমাকে কতবার বলেছি, ওই রতন বা অন্য কোনো ছোকরা এসে অত্যাচার করলে সোজা আমাকে ফোন করবে। ভয় পাওয়ার কী আছে?"


চা এগিয়ে দিতে দিতে মদন কাকা বলেন, "তুই তো নিজের কাজের ধান্ধায় বাইরে বাইরে থাকিস। তোকে কি সব সময় বিরক্ত করা সাজে?"

রুদ্র চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলে, "শোনো, নিরীহ হয়ে থাকা ভালো, কিন্তু অন্যায় সহ্য করাটা বোকামি। আর তোমার মেয়ের ওষুধের জন্য কত টাকা লাগবে? তোমাকে এই নিয়ে কতবার বললাম বলো তো!"

"না না, আর লাগবে না। তুই তো আগের মাসেই..."

"আমি যা জিজ্ঞেস করছি তার সোজাসাপ্টা উত্তর দাও কাকা। কথা ঘোরানোর চেষ্টা করবে না। কাল সকালে আমি দোকানে এসে টাকাটা দিয়ে যাব। ওষুধগুলো কিনে নিও।"

মদন কাকা কথা বাড়ানোর সাহস পান না। রুদ্র মানুষটাই এরকম। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় গম্ভীর, রাগী মানুষ। কিন্তু যারা ওকে চেনে, তারা জানে বাইরে থেকে রূদ্র যতই কঠোর স্বভাবের দেখাক, মনের দিক থেকে ততটাই কোমল হৃদয়ের। তবে শুধু তার জন্য যারা কোনো অন্যায় করে না। আর যারা অন্যায় করে? তাদের কাছে রুদ্র সাক্ষাৎ যমদূত।


মদন কাকার হাতের গরম গরম চা খেয়ে রূদ্র প্রস্থান করে বাড়ির দিকে। রাস্তা দিয়ে হনহন করে সোজাপথে হাটছে। পকেটে হাত, কপালে হালকা চিন্তার ভাঁজ। পাড়ার মোড়ে জটলা করা লোকগুলো ওকে দেখলে রাস্তা ছেড়ে দেয়। যেমন হাট্টাখাট্টা চেহারা, তার চেয়েও ভারী তার গলার আওয়াজ। অন্যায় দেখলে মাথার রগ দপ দপ করে ওঠে তার।

পাড়ায় রতনের বাড়াবাড়ি অনেক বেড়েছে। কানে খবর এসেছে তার। অনেক সুযগ দিয়েছে রূদ্র তাকে, কিন্তু আর না। রতনের ব্যবস্থা সে করবে এবার!


'মদন কাকার মেয়ের ওষুধের টাকাটা কাল সকালে দিয়ে আসতে হবে। লোকটা বড্ড মুখচোরা, নিজে থেকে কিছু চাইবে না। সাথে রতনটাকে সরাসরি ধরতে হবে। বড্ড বাড় বেড়েছে ছেলেটার। কাজের কাজ করবে না। ফটানি মারার সময় এক পায়ে খাড়া। এর পা যদি না ভাঙছি তাহলে আমি রূদ্র রায় না। এক তো এ, তারওপর বাড়িতে ডেইলিকার নতুন টপিক। বিয়ে কবে করবি! আরে, বিয়ে করতে হলে আগে যার সাথে বিয়ে হবে তার সমন্ধে ভালো করে যাচাই করতে হবে তো! নাকি, 'না যান, না পেহেচান, তু বান যা মেরা ইয়ার' লাইফ বানাতে হবে আমাকেও!'

পাড়ার গলিতে বাঁক নিতে, পুরোনো আমলের একটা দোতলা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায় সে। সদর দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে নাকে আসে গরম লুচি আর আলুর দমের গন্ধ। রুদ্রর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে ওঠে। 

"মা! ও মা! খেতে দাও, বড্ড জোর খিদে পেয়েছে!" জুতোটা এক কোণায় খুলতে খুলতে হাঁক পাড়ে রুদ্র।

রান্নাঘর থেকে হাতা হাতে বেরিয়ে আসেন সুজাতা দেবী। ছেলের দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে বলেন, "নবাবপুত্তুরের আসার সময় হলো তাহলে? আমি তো ভাবলাম পাড়ার ওই আড্ডার ঠেকটা তোর আসল বাড়ি, এটা তো শুধু গেস্ট হাউস!"

রুদ্র হাসতে হাসতে এগিয়ে গিয়ে মায়ের কাঁধ জড়িয়ে ধরে। "আহ মা! তুমি রোজ এই এক ডায়লগ দাও। একটু তো পাল্টাও! তা ছাড়া তোমার হাতের আলুর দমের গন্ধ পেলে কি আর আড্ডায় মন টেকে?"

সুজাতা দেবী ছেলের হাতটা আলতো করে সরিয়ে দেন, কিন্তু চোখে মুখে স্নেহের হাসিটা স্পষ্ট ফুটে ওঠে। "হ্যাঁ, আমাকে তো মাখন মাখিয়ে দিচ্ছিস! যা, হাত-মুখ ধুয়ে আয়। আর শোন, আজ কিন্তু তোর বাবা খুব রেগে আছেন। সেই কখন থেকে তোর জন্য বসে আছেন।"

ব্যাস, শুরু হয়ে গেল! রুদ্র মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বাবার আজ নিশ্চয় আবার ওই একই ঘ্যানঘ্যান। কবে বিয়ে করবি, কবে থিতু হবি। উফ! এই এক জ্বালা!

রুদ্র একটু মুখ বাঁকিয়ে বলে, "বাবা রেগে আছেন, না তুমি রাগিয়ে দিয়েছ? তুমি তো আবার কথায় কথায় বাবার কানে মন্তর দাও।"

"কী বললি তুই? আমি মন্তর দিই?" সুজাতা দেবী চোখ পাকিয়ে গরম হাতা তুলে ধরে। "অ্যাই ছেলে, তুই কিন্তু দিন দিন বড্ড ইঁচড়েপাকা হচ্ছিস! আমি তোর মা হই, ইয়ার্কি মারার বন্ধু নই!"

রুদ্র মিটিমিটি হেসে সেন্টার টেবিলে রাখা কৌটো হাতে তোলে। ভেতর থেকে দু-চারটে কাঠবাদাম নিয়ে মুখে পুড়ে। "তুমি তো আমার সেই ছোটবেলার গার্লফ্রেন্ড গো! বাবাকে তো আমি মাঝখান থেকে কাবাব মে হাড্ডি হিসেবে সহ্য করি।"

"মুখপোড়া ছেলে কোথাকার! দাঁড়া, আজ তোর বাবাকে সব বলছি।" সুজাতা দেবী হাসতে হাসতে আবার রান্নাঘরে ঢুকে যান।

রুদ্র সবে সোফায় গা এলিয়ে দিয়েছে, এমন সময় পেছন থেকে বাবার গম্ভীর গলা ভেসে আসে।
"কী রে, খুব তো মায়ের সাথে ইয়ার্কি মারা হচ্ছে! এবার আমার প্রশ্নের উত্তরটা দে দেখি।"

বাবার গলাটা শুনে রুদ্রর হাসিটা একটু মিলিয়ে যায়। সে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে হরিশবাবু দুধের গ্লাস হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

এবার আসল ইন্টারভিউ শুরু! রুদ্র মনে মনে প্রমাদ গোণে। সে সোজা হয়ে বসে। "বলো বাবা, কী জিজ্ঞেস করবে?"

"পরশু দিন যে মেয়েটার ছবি দেখালাম, তার ব্যাপারে কী ভেবেছিস তুই?" হরিশবাবুর গলায় কড়া সুর।

রুদ্র একটু আমতা আমতা করে, "ছবি তো দেখলাম... কিন্তু..."

"কিন্তু কীসের আবার? মেয়ে দেখতে শুনতে ভালো, পড়াশোনাও করেছে। আর কতদিন তুই এই পাড়ার ক্লাবে দাদাগিরি করে বেড়াবি? এবার তো সংসার করতে হবে!"

রুদ্র মাথা চুলকে বলে, "সংসার করব না, এমন কথা তো বলিনি বাবা। তবে ওই ছবি দেখে আর দশ মিনিট কথা বলে কি কাউকে চেনা যায়? তাছাড়া আমার মতো রুক্ষ স্বভাবের মানুষের সাথে কি কোনো শান্তশিষ্ট মেয়ে মানিয়ে নিতে পারবে?" রূদ্র প্রশ্নের তরে হরিশবাবু চুপ হয়ে যায়। রূদ্র রিমোট হাতে নিয়ে নিউজ চ্যানেল চালায়। তবে তার মনে চলতে থাকে সজস্র প্রশ্ন!

'আমার চিন্তা একটাই। আমার যা রাগ, কোনো নিরীহ মেয়ে তো আমার সাথে থাকতে গেলে রোজ হার্ট অ্যাটাক করবে!'