হয়তো বা কোনো একদিন আবার দেখা হবে অচেনা মানুষ হয়ে। একই শহরের কোনো এক ব্যস্ত রাস্তায়, একই আকাশের নিচে, অথচ মাঝখানে থাকবে না কোনো পরিচয়, থাকবে না কোনো অধিকার। শুধু চোখাচোখি হলে হয়তো দুজনের মনেই একসঙ্গে ফিরে আসবে পুরোনো কোনো বিকেল, কোনো অসমাপ্ত কথা, কোনো ভুলে যাওয়া হাসি। কিন্তু সেই দিনের কথা তখনও জারিয়াব জানত না।
সেদিন সকালটা অন্য সব দিনের মতোই ছিল। কলেজের করিডোরে ছাত্রছাত্রীদের ভিড়, কারও হাতে বই, কারও হাতে খাতা, কেউ ক্লাসে যাওয়ার তাড়ায় ছুটছে, আবার কেউ বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। জারিয়াব ইসলামও সেদিন ভীষণ ব্যস্ত ছিল। তার একটা প্রজেক্ট জমা দেওয়ার শেষ দিন। অথচ যতবার ব্যাগ খুলছে, ততবারই একটা না একটা জিনিস বের হচ্ছে, শুধু যেটা দরকার সেটা কিছুতেই পাওয়া যাচ্ছে না।
হঠাৎ সে ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে হতাশ হয়ে বলল, “ইসস! পেনটাই তো নেই!”
প্রজেক্টের শেষ কয়েকটা লাইন লেখা বাকি। আর দশ মিনিটের মধ্যে অফিসে জমা দিতে না পারলে স্যারের কাছে যে কী শুনতে হবে, সেটা জারিয়াব বেশ ভালোভাবেই জানত।
সে চারদিকে তাকিয়ে দেখল, একটু দূরে একজন ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা পেন। জারিয়াব আর কিছু না ভেবেই তার দিকে এগিয়ে গেল।
“Hi.... আপনার কাছে পেন আছে...?”
ছেলেটা একটু অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
“Excuse me....!!”
“পেন হবে...?”
“জি...!”
“আচ্ছা, দেন তাড়াতাড়ি দেন...!!”
ছেলেটা কোনো প্রশ্ন না করে নিজের ব্যাগ থেকে একটা পেন বের করে তার হাতে দিয়ে দিল।
“Thank you!”
পেন হাতে পেয়েই জারিয়াব আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। দ্রুত অফিসের দিকে ছুটে গেল।
কিছুক্ষণ পর প্রজেক্ট জমা দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে আবার সেই ছেলেটার কাছে ফিরে এল সে।
“উফফ! আপনাকে অনেক অনেক thank you!”
ছেলেটা হালকা হেসে বলল, “আরে না, কোনো সমস্যা নেই।”
“আজকে প্রজেক্টটা সাবমিট করতে না পারলে ভীষণ বকা খেতাম স্যারের কাছে।”
কথা বলতে বলতে হঠাৎ জারিয়াবের মনে হলো, ছেলেটাকে আগে কখনো দেখেনি। তাই কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, “By the way, আপনাকে এখানে নতুন দেখছি। আপনি কোন ডিপার্টমেন্ট...?”
কিন্তু ছেলেটা উত্তর দেওয়ার আগেই দূর থেকে তার বন্ধুরা জারিয়াবকে ডাকতে শুরু করল।
“জারিয়াব! এইদিকে আয়!”
জারিয়াব পিছনে তাকিয়ে বলল, “আচ্ছা, বাই...!”
তারপর আবার ছেলেটার দিকে তাকিয়ে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, “কোনো কিছুর help লাগলে আমাকে বলবেন।”
এই বলে সে চলে গেল।
ছেলেটা কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজের পকেটে হাত দিয়ে হঠাৎ থেমে গেল।
“কি আজব একটা মেয়ে! এত কথা বলে মেয়েরা, এটা তো জানতাম না!”
তারপর নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, তার পেনটা নেই।
“আরে! মেয়েটা আমার পেন দিতেও ভুলে গেছে!”
অন্যদিকে জারিয়াব তখন ক্লাসে ঢুকে নিজের জায়গায় বসে পড়েছে। কিছুক্ষণ পর নোট লিখতে গিয়ে তার চোখ পড়ল হাতে থাকা পেনটার দিকে।
সে হঠাৎ থমকে গেল।
“ইসসসস! আমি তো ছেলেটাকে তার পেনটাই দিতে ভুলে গেছি!”
পেনটা হাতে নিয়ে সে ভালো করে দেখতে লাগল। পেনটা বেশ সুন্দর। দেখতে দামিও মনে হচ্ছে।
“একজন স্টুডেন্ট এত দামি পেন নিয়ে লেখালিখি করে?”
জারিয়াব পেনটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখল। তারপর নিজের মনেই বলল, “যাই হোক, পরের বার দেখা হলে দিয়ে দিবো।”
কিন্তু পরের দিন দেখা হলো না।
তার পরের দিনও না।
এক সপ্তাহ কেটে গেল।
জারিয়াবের জীবনে কলেজ, ক্লাস, বন্ধু, পড়াশোনা—সবকিছু আগের মতোই চলতে লাগল। সেই ছেলেটার কথা মাঝে মাঝে মনে পড়লেও সে খুব একটা গুরুত্ব দিল না।
সে জানতও না, একটা সাধারণ পেন ফেরত দেওয়ার অজুহাতেই তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষের সঙ্গে আবার দেখা হতে চলেছে।
একদিন কলেজ ছুটির পর রাস্তার পাশে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ জারিয়াবের চোখ আটকে গেল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজনের দিকে।
ছেলেটাকে দেখেই তার মনে হলো—এই মুখটা সে চেনে।
কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকার পর জারিয়াব চিনতে পারল।
“আরে! এই তো সেই পেনওয়ালা ছেলে!”
সে দ্রুত তার দিকে হাঁটতে শুরু করল।
কাছে গিয়ে বলল, “বাবা! আপনার দেখা-ই পাওয়া যায় না! কোন জগতে আপনার ডিপার্টমেন্ট আছে বলুন তো!”
ছেলেটা অবাক হয়ে তাকাল।
জারিয়াব ব্যাগ থেকে পেনটা বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “এই নেন আপনার পেন। আপনাকে এক সপ্তাহ ধরে খুঁজছি!”
ছেলেটা পেনটা হাতে নিয়ে হালকা হাসল।
“আমি তো ভাবছিলাম আপনি হয়তো ভুলেই গেছেন।”
জারিয়াব একটু বিরক্ত হওয়ার ভান করে বলল, “আরে ধুর! আমি কারও জিনিস নিজের কাছে রাখি না।”
“আচ্ছা।”
“কোথায় যাচ্ছেন?”
“এই তো নদীর সাইডে যাচ্ছি। আপনি যাবেন?”
জারিয়াব সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
“ধুর! আম্মু জানতে পারলে আমাকে আর কলেজের মুখ দেখতেই দেবে না।”
ছেলেটা হেসে বলল, “আরে চলেন না। আপনাকে কেউ দেখবে না।”
“না না না! নদীর সাইডে যেতে পারব না। But আপনি যদি ক্যাফেতে নিয়ে যান, তাহলে যেতে পারি।”
ছেলেটা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “Okay, done. তাহলে ক্যাফেই চলেন।”
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।
কিছুক্ষণ পর তারা একটা সুন্দর ক্যাফের সামনে এসে দাঁড়াল। ক্যাফেটা খুব বড় নয়, কিন্তু ভেতরে শান্ত একটা পরিবেশ। জানালার পাশে কয়েকটা টেবিল, নরম আলো আর হালকা গান বাজছিল।
ভেতরে ঢুকে ছেলেটা দুটো কফি অর্ডার করল।
জারিয়াব চেয়ার টেনে বসে বলল, “আপনি কফি খাবেন তো?”
ছেলেটা হেসে বলল, “আমি তো খাবই। আপনি খাবেন তো?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ! কিন্তু আমার টাইম নেই। লেট হলে আবার সমস্যা।”
“হুম, বুঝতে পারছি আপনার কী সমস্যা।”
“কী?”
“আপনি সবসময় এত তাড়াহুড়ো করে কথা বলেন কেন, সেটাই সমস্যা।”
জারিয়াব হেসে ফেলল।
“আমি এমনই।”
কিছুক্ষণ পর কফি এলো।
জারিয়াব কাপ হাতে নিয়ে হঠাৎ বলল, “আপনার নামটাই তো জানা হলো না!”
ছেলেটা বলল, “জামিল হোসেন।”
“আচ্ছা। আপনার কোন ডিপার্টমেন্ট?”
জামিল মুচকি হেসে বলল, “আমাকে দেখে আপনার কী মনে হয়, আমি স্টুডেন্ট?”
জারিয়াব একদম স্বাভাবিকভাবে বলল, “হ্যাঁ, obviously!”
জামিল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “সরি, but আমি স্টুডেন্ট না।”
জারিয়াবের হাসি ধীরে ধীরে থেমে গেল।
জামিল বলল, “আমি সাইন্স ডিপার্টমেন্টের টিচার।”
জারিয়াবের মুখের অবস্থা মুহূর্তেই বদলে গেল।
তার হাতে থাকা কফির কাপটা যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
“কী...?”
“জি। সাইন্স ডিপার্টমেন্ট।”
জারিয়াবের মনে হলো, এই মুহূর্তে যদি মাটির নিচে একটা গর্ত তৈরি হতো, তাহলে সে সেখানেই ঢুকে যেত।
সে যে একজন শিক্ষকের সঙ্গে এতক্ষণ ‘আপনি কোন ডিপার্টমেন্ট?’ বলে গল্প করছে, তাকে ক্যাফেতে নিয়ে আসার প্রস্তাব দিয়েছে, এমনকি ‘আম্মু জানতে পারলে কলেজের মুখ দেখতেই দেবে না’ পর্যন্ত বলে ফেলেছে—সবকিছু একসঙ্গে মনে পড়তে লাগল।
জামিল কিছু বলার আগেই জারিয়াব তাড়াহুড়ো করে কফিটা শেষ করল। টেবিলে বিলের টাকা রেখে উঠে দাঁড়াল।
“আমি... আসলে... আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
জামিল অবাক হয়ে বলল, “কিন্তু—”
“Bye!”
আর কোনো কথা না শুনেই জারিয়াব ক্যাফে থেকে বেরিয়ে গেল।
রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে নিজের কপালে হাত দিয়ে বলল, “জারিয়াব! কী করছিস তুই?”
তারপর নিজের মাথায় হালকা চাপড় দিয়ে বলল, “তুই একজন টিচারের সঙ্গে ক্যাফেতে বসে কফি খাচ্ছিস! সত্যি তোর মাথা গেছে!”
কিছুক্ষণ থেমে আবার নিজেই বলল, “By the way, উনাকে দেখে তো একদম মনে হয় না উনি একজন টিচার!”
তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “যাই হোক। এবার থেকে স্যারের কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে।”
সেদিনের পর জারিয়াব সত্যিই জামিলকে এড়িয়ে চলতে শুরু করল। করিডোরে দূর থেকে দেখলেও অন্যদিকে চলে যেত। কখনো চোখাচোখি হয়ে গেলে এমনভাবে ব্যস্ত হওয়ার ভান করত যেন পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটা তখনই করতে হবে।
জামিলও প্রথমদিকে বিষয়টা নিয়ে মজা পেত।
কখনো দূর থেকে তাকে দেখে মুচকি হাসত।
কখনো ইচ্ছা করেই বলত, “মিস জারিয়াব, এত তাড়াহুড়ো কোথায়?”
জারিয়াব উত্তর না দিয়ে চলে যেত।
কিন্তু মানুষ কখন যে পরিচিত থেকে প্রিয় হয়ে ওঠে, সেটা কেউ বুঝতে পারে না।
একটা পেন ফেরত দেওয়ার গল্প থেকে শুরু হওয়া পরিচয়টা ধীরে ধীরে বন্ধুত্বে পরিণত হলো।
বন্ধুত্ব থেকে তৈরি হলো এক ধরনের নির্ভরতা।
জামিলের সঙ্গে কথা বললে জারিয়াবের মন ভালো হয়ে যেত। আর জারিয়াবের সঙ্গে কথা বললে জামিলের ব্যস্ত দিনের মাঝেও যেন কিছুটা স্বস্তি আসত।
তাদের কথা কখনো পড়াশোনা নিয়ে, কখনো কলেজের ছোটখাটো ঘটনা নিয়ে, কখনো কোনো সিনেমা বা বই নিয়ে। দিনের শেষে একে অপরকে বলা ছোট ছোট কথাগুলোই ধীরে ধীরে তাদের জীবনের অভ্যাস হয়ে উঠল।
কতগুলো ঋতু যে এভাবে চলে গেল, তারা নিজেরাও বুঝতে পারল না।
একসময় ছয় বছর হয়ে গেল তাদের পরিচয়ের।
ছয় বছর—কম সময় নয়।
এই ছয় বছরে জারিয়াব নিজের জীবনের অনেক কিছু জামিলের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিল। নিজের আনন্দ, কষ্ট, অভিমান, ভয়, স্বপ্ন—সবকিছুর মধ্যেই কোথাও না কোথাও জামিল ছিল।
জারিয়াব বিশ্বাস করত, কিছু মানুষ জীবনে আসে থাকার জন্যই।
সে বুঝতে পারেনি, কখনো কখনো মানুষ থাকার প্রতিশ্রুতি না দিয়েও আমাদের মনে এমন একটা জায়গা তৈরি করে ফেলে, যেখান থেকে তাকে হারানোর কথা ভাবাটাও অসম্ভব মনে হয়।
সময় বদলাতে শুরু করল।
আগের মতো প্রতিদিন কথা হতো না।
আগে জামিল নিজে থেকেই খোঁজ নিত। এখন জারিয়াবকে অপেক্ষা করতে হতো।
আগে ছোট্ট একটা ঘটনা বলার জন্যও জামিল মেসেজ করত। এখন জারিয়াব মেসেজ পাঠালে অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোনো উত্তর আসত না।
জারিয়াব প্রথমদিকে বিষয়টা বুঝতে পারেনি।
নিজেকে বোঝাত, “হয়তো ব্যস্ত।”
কখনো বলত, “হয়তো কাজ আছে।”
কখনো ভাবত, “সব মানুষেরই তো সবসময় কথা বলার মতো সময় থাকে না।”
তাই সে অপেক্ষা করত।
একটা মেসেজের জন্য।
একটা ফোনকলের জন্য।
একটা আগের মতো ‘কেমন আছো?’-এর জন্য।
কিন্তু ধীরে ধীরে সেই অপেক্ষার সময়টা বেড়ে গেল।
আর জারিয়াবের অজান্তেই তাদের গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়টা শেষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
তবুও জারিয়াব তখনও বিশ্বাস করত—সবকিছু ঠিক আছে।
কারণ ছয় বছরের সম্পর্ককে কেউ কি এত সহজে শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে মেনে নিতে পারে?
সে জানত না, কিছু সম্পর্ক ভাঙার আগে শব্দ করে না।
শুধু মানুষ দুজনের মাঝখানে নীরবে একটা দূরত্ব তৈরি হয়।
আর সেই দূরত্বটা একসময় এতটাই বড় হয়ে যায় যে, দুজন একই জায়গায় দাঁড়িয়েও একে অপরের কাছে পৌঁছাতে পারে না।
জারিয়াব তখনও সেই দূরত্বের শুরুটা দেখতে পায়নি।
সে শুধু আগের মতোই জামিলকে নিজের জীবনের সবচেয়ে আপন মানুষ ভেবে অপেক্ষা করে যাচ্ছিল।
আর সময়?
সময় তখন চুপচাপ তাদের গল্পের শেষ পাতাগুলো লিখে চলেছিল।