Pratapaditya 3 in Bengali Fiction Stories by Rajkonya রাজকন্যা books and stories PDF | প্রতাপাদিত্য - 3

Featured Books
  • Wisps of Smoke - 43

    Wisps of Smoke (A love, romantic, psychological and paranorm...

  • Topography of Bali

    The island of Bali, Indonesia can be small, yet its topograp...

  • World Teachers Day

    The Teacher: The Light of Knowledge, Character and Civilizat...

  • THE GHOST BIKE - PART 3

    PROLOGUE — 2017It was a rainy night in 2017.In a small town...

  • ak adhuri mulakat

    एक अधूरी मुलाकातशहर के एक छोटे से कॉलेज में आरव पढ़ाई करता थ...

Categories
Share

প্রতাপাদিত্য - 3

রাতের অন্ধকারে কপোতাক্ষ নদী যেন আগুনের সর্পে ভরে উঠল। দূরে একটার পর একটা আগুনের বিন্দু ধীরে ধীরে বড় হতে শুরু করেছে। নদীর কালো জলের উপর সেই আলো কাঁপছে। আর তার সঙ্গে ভেসে আসছে গভীর যুদ্ধঢাকের শব্দ।ধুম…ধুম…ধুম…প্রতিটি শব্দ যেন বুকের ভেতর আঘাত করছিল।উত্তরের পাহারাদার টাওয়ারে দাঁড়িয়ে প্রতাপ স্থির চোখে তাকিয়ে রইল নদীর দিকে।

তার পাশে বৃদ্ধ নৌসেনাপতি ফিসফিস করে বললেন—“ওরা এসে গেছে…”

প্রতাপ ধীরে ধীরে বলল—“না। ওরা এখানে শুধু শুধু আসেনি।”

তার চোখে আগুনের প্রতিফলন জ্বলল।“ওরা ভয় দেখাতে এসেছে।”

নদীর বুকের উপর এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে বিশাল সব যুদ্ধজাহাজ। সামনের অংশে আগুনের মশাল। দুই পাশে কামান। আর প্রতিটি জাহাজের মাথায় উড়ছে মোগল পতাকা। সবচেয়ে বড় জাহাজটার মাথায় দাঁড়িয়ে আছে এক বিশালদেহী মানুষ।কালো বর্ম।লম্বা দাড়ি।হাতে ভারী তলোয়ার।বৃদ্ধ সেনাপতির মুখ শক্ত হয়ে উঠল।“কাসিম বেগ…”

প্রতাপ ভ্রু কুঁচকে তাকাল।“কে সে?”

বৃদ্ধ লোকটা গলা নিচু করলেন।“আব্রাহাম খাঁর সবচেয়ে নিষ্ঠুর সেনাপতি। যেখানে যায়… সেখানে আগুন রেখে যায়।”

ঠিক তখনই নদীর দিক থেকে শিঙার ভয়ংকর শব্দ ভেসে এলো। মোগল বহর থেমে গেছে। তারপর সবচেয়ে বড় জাহাজটা থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে উঠল—“যশোরের প্রতাপাদিত্য!”

নদীর বাতাস যেন থমকে গেল। প্রতাপ সামনে এগিয়ে এল।“বল।”

কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর সেই কণ্ঠ আবার গর্জে উঠল—“সম্রাট আকবরের আদেশ অমান্য করার শাস্তি জানো?”

প্রতাপের ঠোঁটে ঠান্ডা হাসি ফুটল।“বাংলার মানুষ ভয় পেতে ভুলে গেছে।”

মোগল জাহাজের উপর দাঁড়িয়ে থাকা কাসিম বেগ হেসে উঠল। ভয়ংকর সেই হাসি নদীর উপর প্রতিধ্বনিত হলো।“ভালো।”

সে ধীরে ধীরে হাত তুলল।“তাহলে আগুন দিয়েই শেখাতে হবে।”

পরের মুহূর্তেই—ধাম!!!নদী কেঁপে উঠল। মোগল জাহাজের বিশাল কামান গর্জে উঠল। একটা জ্বলন্ত গোলা সরাসরি নদীর ধারের প্রহরীচৌকিতে আঘাত করল।

বিস্ফোরণ। আগুন মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ল। সৈন্যদের চিৎকার। দৌড়াদৌড়ি। ধোঁয়ায় ঢেকে গেল চারপাশ।এক তরুণ সৈন্য আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল—“ওরা আক্রমণ শুরু করেছে!”

কিন্তু প্রতাপ স্থির। তার চোখে এখন ভয়ংকর শান্তি।সে গর্জে উঠল—“সবাই নিজের জায়গায় যাও!”

তার কণ্ঠস্বর বজ্রের মতো ছড়িয়ে পড়ল।“কেউ ভয় পাবে না!”

সৈন্যরা দ্রুত ছুটতে শুরু করল। কামান প্রস্তুত হচ্ছে।তীরন্দাজরা টাওয়ারে উঠছে। রণতরীগুলো নদীতে নামানো হচ্ছে। পুরো যশোর মুহূর্তের মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হলো।

ঠিক তখনই প্রতাপ নিচু গলায় বৃদ্ধ নৌসেনাপতিকে বলল—“ওরা সরাসরি আক্রমণ করবে না।”

বৃদ্ধ লোকটা অবাক হয়ে তাকালেন।“মানে?”

প্রতাপ নদীর দিকে তাকিয়ে বলল—“এই গোলাবর্ষণ শুধু আমাদের মন ভাঙার জন্য।”

তার চোখ ধীরে ধীরে সরু হয়ে এলো।“আসল আঘাত অন্য কোথাও আসবে।”

ঠিক তখনই—প্রাসাদের ভেতর থেকে হঠাৎ নারীদের চিৎকার ভেসে এলো। প্রতাপের বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। এক সৈন্য দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—“রাজপুত্র! দক্ষিণ প্রাসাদে হামলা!”

প্রতাপের চোখ মুহূর্তে আগুনে জ্বলে উঠল। কারণ দক্ষিণ প্রাসাদেই রাজপরিবারের নারীরা থাকে। সে এক মুহূর্ত দেরি করল না। তরবারি বের করে সোজা ছুটে গেল প্রাসাদের দিকে। পেছনে তার বিশ্বস্ত সৈন্যরা।প্রাসাদের ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল—চারদিকে বিশৃঙ্খলা।

দাসীরা আতঙ্কে দৌড়াচ্ছে। প্রহরীরা আহত হয়ে পড়ে আছে। মশালের আলোয় করিডর রক্তে লাল। আর অন্ধকারের মধ্যে কয়েকটা মুখ ঢাকা ছায়া দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে ভেতরের দিকে।

প্রতাপ গর্জে উঠল—“থামো!”

একজন ঘাতক পিছন ফিরে ছুরি ছুঁড়ে মারল। প্রতাপ তরবারি দিয়ে সেটা সরিয়ে দিল। তারপর ঝড়ের গতিতে সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তরবারির এক আঘাতে একজন ঘাতক মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

কিন্তু বাকিরা থামল না। তারা যেন সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট জায়গার দিকে যাচ্ছে। প্রতাপের বুকের ভেতর হঠাৎ ঠান্ডা ভয় জমে উঠল।

কারণ ওই দিকেই—বিক্রমাদিত্যের কক্ষ।

...................................................

দক্ষিণ প্রাসাদের করিডর তখন রক্ত আর আগুনের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে।

চারদিকে আতঙ্ক।

দাসীদের চিৎকার, প্রহরীদের আর্তনাদ আর বাইরে নদীর দিক থেকে ভেসে আসা কামানের গর্জন—সব মিলিয়ে পুরো প্রাসাদ যেন নরকে পরিণত হয়েছে।

প্রতাপ ঝড়ের মতো ছুটে চলেছে। তার হাতে খোলা তরবারি। চোখে ভয়ংকর আগুন। মুখ ঢাকা ঘাতকগুলো দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে সামনের করিডরের দিকে। আর সেই দিকেই—বিক্রমাদিত্যের কক্ষ।

প্রতাপ গর্জে উঠল—“একটাকেও বাঁচতে দিও না!”

তার সৈন্যরা পেছন থেকে ছুটে এলো। ঠিক তখনই এক ঘাতক আচমকা দেয়ালের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে প্রতাপের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। দু'জন মাটিতে গড়িয়ে পড়ল। ঘাতকের হাতে ছোট বাঁকানো ছুরি।

সে পাগলের মতো আঘাত করতে লাগল। প্রতাপ এক হাতে তার কবজি চেপে ধরে অন্য হাতে ঘুষি মারল মুখে।

লোকটা কেঁপে উঠল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই সে নিজের কোমর থেকে আরেকটা ছুরি বের করল।

প্রতাপের চোখ সংকুচিত হয়ে গেল। সে দ্রুত লোকটার হাত মুচড়ে দিল। হাড় ভাঙার শব্দ। ঘাতক যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল। তারপর প্রতাপ তরবারির এক আঘাতে তাকে নিস্তব্ধ করে দিল।

কিন্তু বাকিরা তখনও ছুটে চলেছে। প্রতাপ উঠে দাঁড়িয়ে আবার দৌড়াল। করিডরের শেষ মাথায় পৌঁছাতেই হঠাৎ দরজা ভেঙে পড়ার শব্দ।

ধাম!!!

প্রতাপের বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। কারণ ওটাই বিক্রমাদিত্যের কক্ষ। সে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। দরজার সামনে পৌঁছে সে দেখল—দু'জন প্রহরী রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। আর ভেতর থেকে ধস্তাধস্তির শব্দ আসছে।

প্রতাপ গর্জে উঠল—“পিতা!”

সে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই মুহূর্তের জন্য সবকিছু থেমে গেল। ঘরের ভেতরে তিনজন মুখ ঢাকা ঘাতক।একজন বিক্রমাদিত্যের দিকে তলোয়ার তাক করে দাঁড়িয়ে আছে।

আর বিক্রমাদিত্য—নিজের পুরনো তরবারি হাতে নিয়ে এখনও লড়ছেন। তার কাঁধ থেকে রক্ত ঝরছে। কিন্তু চোখে ভয় নেই।

প্রতাপের চোখ লাল হয়ে উঠল।“ওঁকে স্পর্শ করার সাহস হলো তোদের?!”

পরের মুহূর্তেই সে ঝড়ের মতো আক্রমণ করল। প্রথম ঘাতক আঘাত ঠেকাতে গেল। কিন্তু প্রতাপের শক্তি এত ভয়ংকর ছিল যে লোকটা সরাসরি দেয়ালে ছিটকে পড়ল।

দ্বিতীয়জন পিছন থেকে ছুরি চালাতে গেল। প্রতাপ শরীর ঘুরিয়ে তার গলায় কনুই মারল। লোকটা হাঁটু গেড়ে পড়ে গেল। তৃতীয় ঘাতক সুযোগ বুঝে বিক্রমাদিত্যের দিকে ছুটল।

প্রতাপ গর্জে উঠল—“না!”

সে সরাসরি সামনে ঝাঁপ দিল। তরবারির সংঘর্ষে আগুনের ফুলকি ছিটকে উঠল। ঘাতকটা অস্বাভাবিক দ্রুত। তার চোখে ভয় নেই। বরং এক ধরনের উন্মাদনা।

সে নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল—“আজ যশোরে রক্ত বইবে…”

প্রতাপ দাঁত চেপে আঘাত করল।“তোর রক্ত আগে বইবে!”

দুজনের তরবারি বারবার সংঘর্ষে কেঁপে উঠছিল ঘর।বিক্রমাদিত্য আহত হয়েও দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিলেন।

হঠাৎ—ঘাতকটা আচমকা নিজের জামার ভেতর থেকে ছোট্ট ধাতব গোলক বের করল। প্রতাপের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।

বারুদ।“সবাই নিচে যাও!”

পরের মুহূর্তেই ভয়ংকর বিস্ফোরণ।

ধাম!!!

ঘর কেঁপে উঠল। আগুন আর ধোঁয়ায় চারদিক ঢেকে গেল। প্রতাপ কয়েক হাত দূরে ছিটকে পড়ল। কানে তীব্র শব্দ বাজছে। চারপাশ ঝাপসা। ধীরে ধীরে সে মাথা তুলল। ঘরের একপাশে আগুন জ্বলছে। কাঠ ভেঙে পড়ছে। ধোঁয়ায় কিছু দেখা যাচ্ছে না।

হঠাৎ—কাশির শব্দ। প্রতাপ দ্রুত তাকাল। বিক্রমাদিত্য মাটিতে পড়ে আছেন। তার বুকের উপর কাঠের ভারী অংশ পড়ে গেছে।

“পিতা!”

প্রতাপ দৌড়ে গিয়ে কাঠ সরানোর চেষ্টা করল। কিন্তু সেটা ভয়ংকর ভারী। বিক্রমাদিত্য কষ্টে চোখ খুললেন।রক্ত তার ঠোঁট বেয়ে নামছে। তিনি খুব কষ্টে বললেন—“প্রতাপ…”

প্রতাপ মরিয়া হয়ে কাঠ সরাতে চেষ্টা করতে লাগল।“কিছু হবে না! আমি আছি!”

বিক্রমাদিত্য ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন। তার চোখে অদ্ভুত শান্তি।

“শোনো…”

বাইরে আবার কামানের গর্জন শোনা গেল। প্রাসাদ কেঁপে উঠল। বিক্রমাদিত্য কষ্টে শ্বাস নিয়ে বললেন—“শত্রু শুধু বাইরে নেই…”

প্রতাপ থেমে গেল। তার চোখে আতঙ্ক। বিক্রমাদিত্য খুব নিচু গলায় ফিসফিস করে বললেন—“বিশ্বাস কোরো না…”

তিনি হঠাৎ কাশতে লাগলেন। রক্ত বেরিয়ে এলো মুখ দিয়ে। প্রতাপের বুক কেঁপে উঠল।

“কাকে বিশ্বাস করব না?!”

বিক্রমাদিত্য ঠোঁট নড়ালেন। একটা নাম বলতে চাইলেন। কিন্তু ঠিক তখনই—ঘরের বাইরে হঠাৎ ভয়ংকর চিৎকার ভেসে এলো।“দক্ষিণ ফটক ভেঙে গেছে!”

......................................................

দক্ষিণ ফটক ভেঙে গেছে! চিৎকারটা যেন বজ্রপাতের মতো আঘাত করল প্রতাপের বুকে। প্রাসাদের বাইরে তখন যুদ্ধের গর্জন।

কামানের শব্দ। মানুষের আর্তনাদ। অস্ত্রের সংঘর্ষ।আর ভেতরে—মাটিতে পড়ে আছেন বিক্রমাদিত্য।রক্তে ভিজে যাচ্ছে তাঁর পোশাক। প্রতাপের বুকের ভেতর যেন আগুন জ্বলতে লাগল।

“পিতা! আপনি কী বলতে চেয়েছিলেন?”সে আবার ঝুঁকে পড়ল।“কাকে বিশ্বাস করব না?”

বিক্রমাদিত্যের ঠোঁট কাঁপল। তিনি যেন কিছু বলতে চাইছেন। একটা নাম। একটা ভয়ংকর সত্য। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে—ধাম!!!

আরেকটা বিস্ফোরণে পুরো প্রাসাদ কেঁপে উঠল।ছাদের কিছু অংশ ভেঙে মাটিতে পড়ে গেল। ধোঁয়া আরও ঘন হয়ে উঠল। একজন সৈন্য দৌড়ে ভেতরে ঢুকল। তার মুখ আতঙ্কে সাদা। “রাজপুত্র! মোগল সৈন্যরা দক্ষিণ ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েছে!”

প্রতাপের চোখে মুহূর্তের জন্য দ্বন্দ্ব দেখা দিল। একদিকে তার পিতা। অন্যদিকে পুরো প্রাসাদ।বিক্রমাদিত্য কষ্টে হাত তুললেন। তার কণ্ঠ দুর্বল।“যাও...”

প্রতাপ মাথা নাড়ল।“না। আমি আপনাকে এ অবস্থায় রেখে যাব না।”

বিক্রমাদিত্য হঠাৎ কঠিন চোখে তাকালেন। সেই চোখে আবার সেই পুরোনো রাজাধিরাজের দৃঢ়তা ফিরে এল।“এটা আদেশ।”

কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা। প্রতাপের বুকের ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে। তারপর সে ধীরে ধীরে মাথা নিচু করল।“আমি ফিরে আসব।”

বিক্রমাদিত্য মৃদু হাসলেন। কিন্তু সেই হাসিতে কেমন যেন এক অদ্ভুত বিষাদ ছিল। যেন তিনি এমন কিছু জানেন...যা প্রতাপ এখনও জানে না।

প্রতাপ উঠে দাঁড়াল। তারপর ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। করিডরে বেরিয়েই সে যুদ্ধের প্রকৃত চেহারা দেখতে পেল। প্রাসাদের ভেতর আগুন। চারদিকে ধোঁয়া। প্রহরীরা প্রাণপণ লড়ছে। দক্ষিণ ফটকের দিকে ছুটে যেতে যেতে সে দেখল—মাটিতে পড়ে আছে পরিচিত মুখগুলো। যাদের সঙ্গে সে ছোটবেলা থেকে বড় হয়েছে। কারও হাতে এখনও তরবারি ধরা। কারও চোখ খোলা। যেন মৃত্যুর আগ পর্যন্তও তারা পাহারা দিয়েছে।

প্রতাপের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। হঠাৎ সামনে থেকে একদল মুখ ঢাকা যোদ্ধা বেরিয়ে এলো। তাদের পোশাক কালো। বুকে আঁকা—কালো সূর্য।

প্রতাপ থেমে গেল। তার চোখ জ্বলে উঠল।“তোমরা...”

একজন ঘাতক হাসল।“অবশেষে দেখা হলো।”

পরের মুহূর্তেই তারা একসঙ্গে আক্রমণ করল। প্রতাপ তরবারি উঁচিয়ে সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

টং!

প্রথম সংঘর্ষেই আগুনের ফুলকি ছিটকে উঠল।একজন।দু'জন।তিনজন।

চারদিক থেকে আঘাত আসছে। কিন্তু প্রতাপ যেন অন্য মানুষ হয়ে গেছে। তার চোখে তখন শুধু ক্রোধ। এক ঘাতকের আঘাত এড়িয়ে গিয়ে সে সরাসরি তার বুকে তরবারি বসিয়ে দিল। আরেকজন পিছন থেকে আক্রমণ করতে গেল।

প্রতাপ ঘুরে তার কবজি কেটে দিল। লোকটা যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল। কিন্তু বাকিরা থামল না। বরং তারা যেন সময় নষ্ট করতে চাইছে। প্রতাপের হঠাৎ মনে হলো—এরা তাকে আটকে রাখছে। তার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।

“কেন?”

সে চারদিকে তাকাল। তারপর হঠাৎ তার চোখ বড় হয়ে গেল। কারণ দক্ষিণ ফটকের দিক থেকে মূল আক্রমণ আসছে না। সেটা শুধু বিভ্রান্তি। আসল লক্ষ্য অন্য কোথাও।

ঠিক তখনই—প্রাসাদের উত্তর প্রান্ত থেকে ভয়ংকর শিঙার শব্দ ভেসে এলো। একজন আহত সৈন্য দৌড়ে এসে মাটিতে পড়ে গেল। রক্তে ভেজা শরীর। সে কষ্টে বলল—“রাজপুত্র...”

প্রতাপ তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল।“বল!”

সৈন্যটা কাঁপতে কাঁপতে বলল—“রাজকোষাগার...”

তার শ্বাস কেঁপে উঠল।“ওরা রাজকোষাগারে ঢুকে পড়েছে...”

প্রতাপের মুখ মুহূর্তে শক্ত হয়ে গেল। কারণ রাজকোষাগারে শুধু সোনা ছিল না। সেখানে ছিল—যশোরের গোপন নথি। সামরিক মানচিত্র। গোপন সুড়ঙ্গের বিবরণ। আর বহু বছরের রাজনৈতিক গোপন তথ্য।

যদি সেগুলো শত্রুর হাতে যায়—তাহলে শুধু একটা যুদ্ধ নয়...পুরো রাজ্য বিপদে পড়ে যাবে। ঠিক তখনই দূরে রাজকোষাগারের দিক থেকে আগুনের লেলিহান শিখা আকাশ ছুঁয়ে উঠল। আর সেই আগুনের আলোয় প্রতাপ যেন এক ছায়ামূর্তিকে দেখতে পেল। প্রাসাদের ছাদের উপর দাঁড়িয়ে আছে সে। মুখ ঢাকা। কালো পোশাক।

আর তার হাতের মশালের আলোয় এক মুহূর্তের জন্য চকচক করে উঠল—একটি সোনালি আংটি। ঠিক সেই একই আংটি...যেটা কয়েক রাত আগে প্রতাপ অস্ত্রাগারের ধ্বংসস্তূপে পেয়েছিল।

আর তখনই তার মনে ভয়ংকর এক প্রশ্ন জেগে উঠল—এই ষড়যন্ত্রের পেছনে কি সত্যিই শুধু মোগলরা আছে? নাকি যশোরের ক্ষমতার কেন্দ্রেই লুকিয়ে আছে আরও বড় কোনো শত্রু?

....................................................

দক্ষিণ ফটক ভেঙে গেছে! চিৎকারটা যেন বজ্রপাতের মতো আঘাত করল প্রতাপের বুকে। প্রাসাদের বাইরে তখন যুদ্ধের গর্জন।

কামানের শব্দ। মানুষের আর্তনাদ। অস্ত্রের সংঘর্ষ।আর ভেতরে—মাটিতে পড়ে আছেন বিক্রমাদিত্য।রক্তে ভিজে যাচ্ছে তাঁর পোশাক। প্রতাপের বুকের ভেতর যেন আগুন জ্বলতে লাগল।

“পিতা! আপনি কী বলতে চেয়েছিলেন?”সে আবার ঝুঁকে পড়ল।“কাকে বিশ্বাস করব না?”

বিক্রমাদিত্যের ঠোঁট কাঁপল। তিনি যেন কিছু বলতে চাইছেন। একটা নাম। একটা ভয়ংকর সত্য। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে—ধাম!!!

আরেকটা বিস্ফোরণে পুরো প্রাসাদ কেঁপে উঠল।ছাদের কিছু অংশ ভেঙে মাটিতে পড়ে গেল। ধোঁয়া আরও ঘন হয়ে উঠল। একজন সৈন্য দৌড়ে ভেতরে ঢুকল। তার মুখ আতঙ্কে সাদা। “রাজপুত্র! মোগল সৈন্যরা দক্ষিণ ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েছে!”

প্রতাপের চোখে মুহূর্তের জন্য দ্বন্দ্ব দেখা দিল। একদিকে তার পিতা। অন্যদিকে পুরো প্রাসাদ।বিক্রমাদিত্য কষ্টে হাত তুললেন। তার কণ্ঠ দুর্বল।“যাও...”

প্রতাপ মাথা নাড়ল।“না। আমি আপনাকে এ অবস্থায় রেখে যাব না।”

বিক্রমাদিত্য হঠাৎ কঠিন চোখে তাকালেন। সেই চোখে আবার সেই পুরোনো রাজাধিরাজের দৃঢ়তা ফিরে এল।“এটা আদেশ।”

কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা। প্রতাপের বুকের ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে। তারপর সে ধীরে ধীরে মাথা নিচু করল।“আমি ফিরে আসব।”

বিক্রমাদিত্য মৃদু হাসলেন। কিন্তু সেই হাসিতে কেমন যেন এক অদ্ভুত বিষাদ ছিল। যেন তিনি এমন কিছু জানেন...যা প্রতাপ এখনও জানে না।

প্রতাপ উঠে দাঁড়াল। তারপর ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। করিডরে বেরিয়েই সে যুদ্ধের প্রকৃত চেহারা দেখতে পেল। প্রাসাদের ভেতর আগুন। চারদিকে ধোঁয়া। প্রহরীরা প্রাণপণ লড়ছে। দক্ষিণ ফটকের দিকে ছুটে যেতে যেতে সে দেখল—মাটিতে পড়ে আছে পরিচিত মুখগুলো। যাদের সঙ্গে সে ছোটবেলা থেকে বড় হয়েছে। কারও হাতে এখনও তরবারি ধরা। কারও চোখ খোলা। যেন মৃত্যুর আগ পর্যন্তও তারা পাহারা দিয়েছে।

প্রতাপের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। হঠাৎ সামনে থেকে একদল মুখ ঢাকা যোদ্ধা বেরিয়ে এলো। তাদের পোশাক কালো। বুকে আঁকা—কালো সূর্য।

প্রতাপ থেমে গেল। তার চোখ জ্বলে উঠল।“তোমরা...”

একজন ঘাতক হাসল।“অবশেষে দেখা হলো।”

পরের মুহূর্তেই তারা একসঙ্গে আক্রমণ করল। প্রতাপ তরবারি উঁচিয়ে সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

টং!

প্রথম সংঘর্ষেই আগুনের ফুলকি ছিটকে উঠল।একজন।দু'জন।তিনজন।

চারদিক থেকে আঘাত আসছে। কিন্তু প্রতাপ যেন অন্য মানুষ হয়ে গেছে। তার চোখে তখন শুধু ক্রোধ। এক ঘাতকের আঘাত এড়িয়ে গিয়ে সে সরাসরি তার বুকে তরবারি বসিয়ে দিল। আরেকজন পিছন থেকে আক্রমণ করতে গেল।

প্রতাপ ঘুরে তার কবজি কেটে দিল। লোকটা যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল। কিন্তু বাকিরা থামল না। বরং তারা যেন সময় নষ্ট করতে চাইছে। প্রতাপের হঠাৎ মনে হলো—এরা তাকে আটকে রাখছে। তার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।

“কেন?”

সে চারদিকে তাকাল। তারপর হঠাৎ তার চোখ বড় হয়ে গেল। কারণ দক্ষিণ ফটকের দিক থেকে মূল আক্রমণ আসছে না। সেটা শুধু বিভ্রান্তি। আসল লক্ষ্য অন্য কোথাও।

ঠিক তখনই—প্রাসাদের উত্তর প্রান্ত থেকে ভয়ংকর শিঙার শব্দ ভেসে এলো। একজন আহত সৈন্য দৌড়ে এসে মাটিতে পড়ে গেল। রক্তে ভেজা শরীর। সে কষ্টে বলল—“রাজপুত্র...”

প্রতাপ তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল।“বল!”

সৈন্যটা কাঁপতে কাঁপতে বলল—“রাজকোষাগার...”

তার শ্বাস কেঁপে উঠল।“ওরা রাজকোষাগারে ঢুকে পড়েছে...”

প্রতাপের মুখ মুহূর্তে শক্ত হয়ে গেল। কারণ রাজকোষাগারে শুধু সোনা ছিল না। সেখানে ছিল—যশোরের গোপন নথি। সামরিক মানচিত্র। গোপন সুড়ঙ্গের বিবরণ। আর বহু বছরের রাজনৈতিক গোপন তথ্য।

যদি সেগুলো শত্রুর হাতে যায়—তাহলে শুধু একটা যুদ্ধ নয়...পুরো রাজ্য বিপদে পড়ে যাবে। ঠিক তখনই দূরে রাজকোষাগারের দিক থেকে আগুনের লেলিহান শিখা আকাশ ছুঁয়ে উঠল। আর সেই আগুনের আলোয় প্রতাপ যেন এক ছায়ামূর্তিকে দেখতে পেল। প্রাসাদের ছাদের উপর দাঁড়িয়ে আছে সে। মুখ ঢাকা। কালো পোশাক।

আর তার হাতের মশালের আলোয় এক মুহূর্তের জন্য চকচক করে উঠল—একটি সোনালি আংটি। ঠিক সেই একই আংটি...যেটা কয়েক রাত আগে প্রতাপ অস্ত্রাগারের ধ্বংসস্তূপে পেয়েছিল।

আর তখনই তার মনে ভয়ংকর এক প্রশ্ন জেগে উঠল—এই ষড়যন্ত্রের পেছনে কি সত্যিই শুধু মোগলরা আছে? নাকি যশোরের ক্ষমতার কেন্দ্রেই লুকিয়ে আছে আরও বড় কোনো শত্রু?

................................................

রাত তখন যেন উন্মাদ হয়ে উঠেছে। যশোর রাজপ্রাসাদের উপর আগুনের লেলিহান শিখা আকাশ ছুঁতে চাইছে। ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে চারদিক। দূরে নদীর বুক থেকে এখনও মোগল যুদ্ধজাহাজের কামানের গর্জন ভেসে আসছে।

আর সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই প্রতাপ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখ ছাদের উপর দাঁড়িয়ে থাকা সেই রহস্যময় ছায়ামূর্তির দিকে। মশালের আলোয় এক মুহূর্তের জন্য যে সোনালি আংটিটা ঝলসে উঠেছিল—সেটা সে ভুল দেখেনি।

একই আংটি। একই চিহ্ন। অস্ত্রাগারের ধ্বংসস্তূপে পাওয়া আংটি। প্রতাপের বুকের ভেতর ঠান্ডা একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। কারণ এখন ব্যাপারটা শুধু যুদ্ধ নয়।

এটা ষড়যন্ত্র। আর সেই ষড়যন্ত্র অনেক দিন ধরে তৈরি হচ্ছে। ঠিক তখনই ছায়ামূর্তিটা হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল।প্রতাপ গর্জে উঠল—“ওকে ধরো!”

সে নিজেই সামনে ছুটে গেল। তার সৈন্যরাও পেছনে দৌড়াল। কিন্তু লোকটা যেন বাতাস। ছাদের উপর দিয়ে অসম্ভব দ্রুত ছুটতে লাগল। আগুনের আলোয় তার কালো পোশাক বারবার অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।

প্রতাপ একটা ভাঙা সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে পড়ল।উপরে পৌঁছে সে দেখল—লোকটা ইতিমধ্যে অন্য প্রান্তে পৌঁছে গেছে। দূরে জ্বলছে রাজকোষাগার।

আগুনের আলোয় পুরো আকাশ লাল। প্রতাপ দাঁত চেপে দৌড়াতে লাগল। ছাদের কাঠের অংশগুলো ভেঙে পড়ছে। ধোঁয়ায় চোখ জ্বলছে।

কিন্তু সে থামল না। হঠাৎ—লোকটা থেমে গেল।প্রতাপও কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে গেল। দুজনের মাঝে শুধু আগুনের আলো।

আর নিচে যুদ্ধ। লোকটা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। তার মুখ এখনও ঢাকা। কিন্তু চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে।অস্বাভাবিক শান্ত। প্রতাপ ঠান্ডা গলায় বলল—“তুই কে?”

লোকটা হালকা হাসল।“অনেক দেরিতে প্রশ্নটা করলে।”

প্রতাপের মুঠি শক্ত হয়ে উঠল।“অস্ত্রাগার... টাওয়ার... রাজকোষাগার... সব তোর কাজ?”

লোকটা উত্তর দিল না। বরং ধীরে ধীরে বলল—“তুমি ভাবছ যুদ্ধটা মোগলদের বিরুদ্ধে?”

কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর সে মাথা নেড়ে হাসল।“তুমি এখনও কিছুই জানো না প্রতাপাদিত্য।”

বাতাস যেন হঠাৎ আরও ঠান্ডা হয়ে উঠল। প্রতাপ তরবারি তুলে ধরল।“তোর পরিচয় বল।”

লোকটা এবার নিজের হাতে থাকা মশালটা ছুঁড়ে ফেলল। আগুন নিচে পড়ে বিস্ফোরিত হলো। তারপর খুব শান্ত স্বরে বলল—“তোমার সবচেয়ে বড় শত্রু দিল্লিতে নেই।”

প্রতাপের চোখ সরু হয়ে এলো।“তাহলে কোথায়?”

লোকটা কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের বুকে হাত রাখল।“তোমার ঘরের ভেতর।”

প্রতাপের বুকের ভেতর যেন বজ্রপাত হলো। বসন্ত রায়ের কথা? বিক্রমাদিত্যের অসমাপ্ত সতর্কবার্তা?গোপন সুড়ঙ্গের মানচিত্র? সব একসঙ্গে মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল।

ঠিক তখনই লোকটা আচমকা কোমর থেকে একটা ছোট ধাতব বস্তু বের করল। প্রতাপের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।

বারুদ।আরেকটা বিস্ফোরক।

“না!” প্রতাপ সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু দেরি হয়ে গেছে।

ধাম!!! ভয়ংকর বিস্ফোরণে পুরো ছাদ কেঁপে উঠল।কাঠের বিম ভেঙে পড়তে লাগল। আগুন চারদিকে ছড়িয়ে গেল। প্রতাপ কয়েক হাত দূরে ছিটকে পড়ল।তার কানে তীব্র শব্দ বাজছে। চোখ ঝাপসা।

ধীরে ধীরে সে মাথা তুলল। চারপাশ ধোঁয়ায় ঢাকা। কিন্তু লোকটা নেই। অদৃশ্য। যেন কখনও ছিলই না।প্রতাপ দাঁতে দাঁত চেপে উঠে দাঁড়াল।

তারপর হঠাৎ—দূরে রাজপ্রাসাদের প্রধান মিনার থেকে বিপদসংকেতের ঘণ্টা বেজে উঠল। একবার। দুবার।তিনবার।

বৃদ্ধ নৌসেনাপতি দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন—“রাজপুত্র!”

প্রতাপ ঘুরে তাকাল। লোকটার মুখে আতঙ্ক।“কী হয়েছে?”

বৃদ্ধ লোকটা গলা শুকিয়ে আসা স্বরে বললেন—“রাজকোষাগার শুধু লুট হয়নি...”

তিনি থেমে গেলেন। প্রতাপের বুকের ভেতর অজানা আশঙ্কা জমল।“বল।”

বৃদ্ধ লোকটা কাঁপতে কাঁপতে বললেন।“সেখানে রাখা রাজবংশের গোপন দলিলও চুরি গেছে।”

প্রতাপের মুখ শক্ত হয়ে গেল।“কোন দলিল?”

বৃদ্ধ নৌসেনাপতি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন।তারপর ফিসফিস করে বললেন—“সেই দলিল... যেটা প্রকাশ পেলে যশোরের সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে।”

চারদিকে যেন হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেল। আগুন জ্বলছে। যুদ্ধ চলছে। তবু প্রতাপের কানে যেন আর কিছুই পৌঁছাচ্ছে না।

কারণ প্রথমবার—সে অনুভব করল, এই যুদ্ধ শুধু রাজ্য রক্ষার নয়। এটা হয়তো তার নিজের পরিচয় রক্ষার যুদ্ধও হতে চলেছে।

................................................

রাতের আকাশ লাল হয়ে আছে। রাজপ্রাসাদের বিভিন্ন অংশে এখনও আগুন জ্বলছে। ধোঁয়ার কালো স্তম্ভ আকাশের দিকে উঠছে। দূরে নদীর বুক থেকে মোগল যুদ্ধজাহাজগুলোর মশালের আলো দেখা যাচ্ছে।

কিন্তু প্রতাপের কাছে যেন সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেছে।তার মাথার ভেতর শুধু একটা কথাই ঘুরছে—“সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে...”

বৃদ্ধ নৌসেনাপতির মুখ এখনও ফ্যাকাসে। প্রতাপ ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল। তার কণ্ঠস্বর অস্বাভাবিক শান্ত।“সব বলো।”

বৃদ্ধ লোকটা চারদিকে তাকালেন। যেন দেয়ালও তাদের কথা শুনে ফেলতে পারে। তারপর নিচু গলায় বললেন—“এই কথা আমি কোনোদিন বলতে চাইনি।”

প্রতাপের চোখ আরও কঠিন হয়ে উঠল।“আজ বলতে হবে।”

বৃদ্ধ নৌসেনাপতি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আগুনের আলো তার মুখে অদ্ভুত ছায়া ফেলছে।“বহু বছর আগে... যশোর রাজ্যের ভেতরে এমন কিছু ঘটেছিল, যেটা কেউ প্রকাশ করতে চায়নি।”

প্রতাপের বুকের ভেতর ধীরে ধীরে চাপা অস্বস্তি জমতে লাগল।“কী ঘটেছিল?”

লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন—“সেই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজপরিবারের উত্তরাধিকার।”

হঠাৎ দূরে আবার যুদ্ধঢাক বেজে উঠল।ধুম...ধুম...ধুম...

কিন্তু প্রতাপের মনোযোগ একটুও সরে গেল না।“সরাসরি বলো।”

বৃদ্ধ লোকটা ঠোঁট ভিজিয়ে নিলেন।“তোমার জন্মের আগের কথা।”

বাতাস যেন হঠাৎ থেমে গেল।“সেই সময়ে রাজপরিবারে ক্ষমতা নিয়ে অনেক দ্বন্দ্ব ছিল। অনেকেই চাইত না নির্দিষ্ট শাখার হাতে ভবিষ্যতে রাজ্য যাক।”

প্রতাপের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।“আর?”

“আর তখনই তৈরি হয় একটা গোপন নথি।”

“কিসের নথি?”

বৃদ্ধ লোকটার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।“কারা প্রকৃত উত্তরাধিকারী... আর কারা নয়।”

প্রতাপ স্থির হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত সে কোনো কথা বলতে পারল না। তারপর ধীরে ধীরে বলল—“তুমি কি বলতে চাইছ... কেউ আমার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে?”

বৃদ্ধ লোকটা চোখ নামিয়ে ফেললেন।“যদি নথিটা ভুল মানুষের হাতে যায়... হ্যাঁ।”

প্রতাপের বুকের ভেতর রক্ত যেন ফুটতে শুরু করল।ঠিক তখনই—পেছন থেকে এক গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো।“ওকে আর কিছু বলার দরকার নেই।”

প্রতাপ ঘুরে দাঁড়াল। মশালের আলোয় ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসছেন বসন্ত রায়। তার মুখ গম্ভীর।চোখে অদ্ভুত একটা দৃষ্টি। বৃদ্ধ নৌসেনাপতির মুখ মুহূর্তে বিবর্ণ হয়ে গেল।

“আপনি...”

বসন্ত রায় ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালেন।“তুমি অনেক বেশি কথা বলছ।”

পরিস্থিতি মুহূর্তে ভারী হয়ে উঠল। প্রতাপ স্থির চোখে কাকার দিকে তাকিয়ে রইল।“আপনি কি জানেন সেই নথির কথা?”

বসন্ত রায় কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন—“জানি।”

প্রতাপের বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।“তাহলে এতদিন বলেননি কেন?”

বসন্ত রায় আগুনের দিকে তাকালেন। জ্বলন্ত কাঠ ভেঙে পড়ার শব্দ হলো।

“কারণ কিছু সত্য মানুষকে শক্তিশালী করে না।”তিনি ধীরে ধীরে প্রতাপের দিকে তাকালেন।“ধ্বংস করে।”

কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। প্রতাপ বুঝতে পারছিল না—এই মানুষটা তাকে রক্ষা করতে চাইছেন? নাকি কিছু লুকাচ্ছেন? ঠিক তখনই দূরে প্রাসাদের ভেতর থেকে একটা আতঙ্কিত চিৎকার শোনা গেল।“মহারাজ!”আরেকটা চিৎকার।“মহারাজ বিক্রমাদিত্য!”

প্রতাপের বুক ধক করে উঠল। সে এক মুহূর্তও দেরি করল না। প্রাসাদের ভেতরের দিকে ছুটে গেল। পেছনে বসন্ত রায় আর সৈন্যরা। বিক্রমাদিত্যের কক্ষের সামনে পৌঁছেই প্রতাপ থেমে গেল।

চারদিকে নিস্তব্ধতা। অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা। মশালের আলো কাঁপছে। দরজা আধখোলা। প্রতাপ ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। ঘরের ভেতরে এখনও ধোঁয়ার গন্ধ। ভাঙা কাঠ। রক্ত। আর...

মাটিতে শুয়ে আছেন বিক্রমাদিত্য। নড়ছেন না।একজন রাজবৈদ্য তার পাশে বসে আছেন। তার মুখ নিচু। প্রতাপের বুকের ভেতর হঠাৎ ভয়ংকর শূন্যতা জন্ম নিল। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।“পিতা...”কোনো উত্তর নেই।“পিতা...”

তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল। রাজবৈদ্য চোখ তুলে তাকালেন। তার চোখ ভিজে। তিনি ধীরে ধীরে মাথা নিচু করলেন। প্রতাপের চারপাশের পৃথিবী যেন থেমে গেল।

বাইরে যুদ্ধ চলছে। আগুন জ্বলছে। কিন্তু তার কানে কিছুই পৌঁছাচ্ছে না। কারণ সে বুঝে গেছে—তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্তম্ভটা ভেঙে পড়েছে।

ঠিক তখনই—বিক্রমাদিত্যের নিথর হাতের নিচে চাপা পড়ে থাকা একটা ছোট কাগজ প্রতাপের চোখে পড়ল।কাঁপা হাতে সে কাগজটা তুলে নিল। সেখানে মাত্র তিনটি শব্দ লেখা।রক্তমাখা অক্ষরে।"বিশ্বাস করো না..."আর সেই অসমাপ্ত বার্তার নিচে—কাঁপা হাতে লেখা একটি নামের প্রথম অক্ষর।"ব..."

প্রতাপের চোখ স্থির হয়ে গেল। তার বুকের ভেতর যেন বজ্রপাত হলো। কারণ এই একটি অক্ষর—পুরো যশোর রাজ্যকে সন্দেহের আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। 🔥

চলবে.............................................