পরদিন সকালেই বাড়িতে পৌঁছল আরও তিনজন মানুষ। সুশান্ত চৌধুরীর ছোটো ভাইপো সুকান্ত চৌধুরী, যিনি বাড়ির সম্পত্তির দেখাশোনা করতেন। সুশান্ত চৌধুরীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. অর্ণব সেন। বহু বছর ধরে পরিবারের সঙ্গে থাকা হিসাবরক্ষক হরিপদ মিত্র আর বাড়ির পুরোনো পরিচারিকা কমলা।
অনুব্রত অবাক হয়েছিলো সুকান্তকে দেখে। ছোটোবেলায় সুকান্ত ছিল তার খেলার সঙ্গী। যদিও বা অনুব্রতর চেয়ে সুকান্ত দশ বছরের বড়ো । কিন্তু এখন সুকান্তর চোখে অদ্ভুত একটা শূন্যতা। কথা বলার সময় সে বারবার উত্তর দিকের করিডরের দিকে তাকাচ্ছিলো।
"কাকা মারা যাওয়ার আগে তোকে একটা চিঠি লিখেছিলেন, তাই না?" সুকান্ত জিজ্ঞেস করলো।
অনুব্রত চমকে তাকালো।
"তুই জানলি কী করে?" , অনুব্রত জিজ্ঞাসা করলো ।
"কাকা শেষ কয়েক দিন ধরে শুধু তোর কথাই বলতেন।" , সুকান্ত বললো ।
"আর কিছু বলেছিলেন?" , অনুব্রত বললো ।
সুকান্ত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো , "বলেছিলেন, পুরোনো হিসাব মেটানোর সময় এসেছে।"
"কীসের হিসাব?" , অনুব্রত জিজ্ঞাসা করলো ।
সুকান্ত উত্তর দিলো না।
সেদিন দুপুরে বাড়ির দোতলার পুরোনো গ্রন্থাগারে একটা পারিবারিক বৈঠক বসেছিল। গ্রন্থাগারে পারিবারিক বৈঠকে হরিপদ মিত্র কে না দেখতে পেয়ে ডা. অর্ণব সেন সুকান্ত কে জিজ্ঞাসা করলো , হরিপদ বাবু কোথায়? উনি আসবেন না?
সুকান্ত বললো , ওনার একটু শরীর খারাপ লাগছিলো। তাই উনি একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন। একটু পরে উনি আসবেন।
ডা. অর্ণব সেন মাথা নেড়ে বললেন ঠিক আছে ।
তারপর ডা. অর্ণব সেন একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলেন এবং বললেন , সুশান্ত বাবুর মৃত্যুর আগে ওনার মানসিক অবস্থা ভালো ছিল না। তিনি নাকি প্রায়ই বলতেন, বাড়ির মধ্যে কেউ ঘুরে বেড়ায়। কখনো তাঁর স্ত্রীর গলা শুনতে পেতেন। কখনো মৃত মায়ের। কখনো এমন একজনের, যার মৃত্যু বহু বছর আগে হয়েছে।
সুকান্ত কথাগুলো শুনে অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসলো।
"বাড়িতে পুরোনো ঘটনা নিয়ে আলোচনা না করাই ভালো," সুকান্ত বললো।
অনুব্রত সরাসরি সুকান্তর দিকে তাকালো।
তারপর বললো , "কোন পুরোনো ঘটনা?"
সুকান্ত চশমা খুলে কাঁচ মুছতে মুছতে বললো , "যা ভুলে যাওয়াই ভালো।"
অনুব্রত জিজ্ঞাসা করলো , "আমার মা কোথায়?"
প্রশ্নটা শুনে ঘরের মধ্যে অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো । সুকান্ত উঠে দাঁড়িয়ে বললো , "এই আলোচনা এখন থাক।"
অনুব্রত সুকান্তর হাত চেপে ধরে বললো , " আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কেউ কোথাও যাবে না।"
ঠিক তখনই বাড়ির সমস্ত ঘড়ি একসঙ্গে বেজে উঠল।
টং।
টং।
টং।
অনুব্রত দেওয়ালের ঘড়িটার দিকে তাকালো। সময় দুপুর একটা বেজে তেরো মিনিট। কিন্তু ঘড়িটা হঠাৎ থেমে গেলো। তারপর গ্রন্থাগারের বাইরে থেকে একটা মেয়ের হাসির শব্দ শোনা গেলো। খিলখিল করে হাসছে কেউ।
সবাই চেয়ার থেকে উঠে দরজার দিকে ছুটলো। কিন্তু দরজা খোলার আগেই বাইরে থেকে একটা ভয়ংকর আর্তনাদ শোনা গেলো। তারপর সব চুপ। দরজা খুলে সবাই করিডরে বেরিয়ে এলো । সিঁড়ির নিচে হরিপদ মিত্র পড়ে আছে।
তাঁর চোখ দুটো অস্বাভাবিকভাবে খোলা। নাক আর মুখ থেকে রক্ত বেরিয়ে এসেছে। ডান হাতের মুঠোয় চেপে ধরা একটা ছোট্ট রুপোর চাবি। তাঁর গলায় কালচে দাগ। যেন কেউ দুই হাতে গলা টিপে ধরেছিল।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তাঁর শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। সিঁড়ির ধুলোতেও কোনো পায়ের ছাপ নেই।
ডা. অর্ণব সেন দ্রুত পরীক্ষা করে বললো , "মারা গেছেন।"
সুকান্ত পিছিয়ে গেলো।
তারপর আতঙ্কিত স্বরে বললো , "এটা কী করে সম্ভব?"
অনুব্রত হাঁটু গেড়ে মৃতদেহের পাশে বসল।
হরিপদর হাতের মুঠো খুলতে গিয়ে সে দেখল, রুপোর চাবির সঙ্গে একটা ছোট্ট কাগজ আটকে আছে।
কাগজে কাঁপা হাতে লেখা—
'প্রথম পাপের শাস্তি ।‘
পুলিশকে খবর দেওয়া হলো। বিকেলের মধ্যে থানার ইন্সপেক্টর অনিকেত মুখার্জি এসে পৌঁছলেন। চল্লিশের কাছাকাছি বয়স। বহু খুনের তদন্ত করেছেন। ভূতপ্রেতের গল্পে তাঁর বিন্দুমাত্র বিশ্বাস ছিল না।
তিনি মৃতদেহ পরীক্ষা করে বললেন, "খুন হয়েছে। খুব সম্ভবত শ্বাসরোধ করে মারা হয়েছে।"
অনুব্রত বললো , "কিন্তু এখানে তো কেউ ছিল না।"
ইন্সপেক্টর ঠান্ডা গলায় উত্তর দিলো , "কেউ ছিল না, সেটা আপনি কী করে জানলেন? খুনি সবসময় চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে না।"
"তাহলে খুনের সময়?" অনুব্রত জিজ্ঞাসা করলো ।
"মৃত্যুর সঠিক সময় ময়নাতদন্তের আগে বলা যাবে না। " , ইন্সপেক্টর অনিকেত বললো ।
ইন্সপেক্টর অনিকেত হরিপদর মুঠো থেকে কাগজটা তুলে ধরে বললেন , "খুনি চাইছে, আমরা এই বাড়ির অতীত খুঁড়ে দেখি।"