রাত তখন শেষ প্রহরের দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু যশোর রাজপ্রাসাদের আকাশে এখনও আগুনের লাল আভা ছড়িয়ে আছে। দূরে নদীর কালো জলের উপর মোগল জাহাজগুলোর মশাল জ্বলছে। পূর্ব প্রাচীরের বাইরে রহস্যময় কালো সূর্যের বাহিনী অবস্থান নিয়েছে। আর প্রাসাদের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে প্রতাপাদিত্য—যার চারপাশে একের পর এক রহস্যের জাল আরও ঘন হয়ে উঠছে। গোবিন্দ দাসের শেষ কথাগুলো এখনও যেন বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে—“যারা তোমার জন্মেরও আগে থেকে এই দিনের অপেক্ষা করছে...”
প্রতাপ ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এল। তার চোখে তখন তীব্র আগুনের ঝলক। গম্ভীর স্বরে সে বলল, “সব বল।”
গোবিন্দ দাস কিছুক্ষণ নীরবে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর মুখে এক অদ্ভুত শান্ত ভাব। তারপর অত্যন্ত ধীর কণ্ঠে বললেন, “এখন আর বলার সময় নেই।”
প্রতাপ বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করল, “মানে?”
গোবিন্দ দাস গভীর শ্বাস নিয়ে শুধু বললেন, “কারণ তারা এসে গেছে।”
ঠিক সেই মুহূর্তেই প্রাসাদের পূর্ব প্রাচীরের দিক থেকে যুদ্ধের শিঙার কর্কশ ধ্বনি ভেসে এল। একবার... দুবার... তারপর একটানা। মুহূর্তের মধ্যেই চারদিকে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গেল। একজন সৈন্য প্রাণপণে দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “রাজপুত্র! পূর্ব ফটকের সামনে হাজার হাজার সৈন্য জড়ো হয়েছে!”
প্রতাপ দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল। তার কণ্ঠে উদ্বেগের বদলে ছিল দৃঢ়তা। “কতজন?”
সৈন্যটি মাথা নাড়িয়ে বলল, “গুনে শেষ করা যাচ্ছে না!”
পরিস্থিতি বুঝেই বসন্ত রায় গর্জে উঠলেন, “সব তীরন্দাজকে প্রাচীরে পাঠাও! কামান প্রস্তুত করো! কেউ নিজের অবস্থান ছাড়বে না!”
মুহূর্তের মধ্যেই পুরো প্রাসাদ আবার যুদ্ধের প্রস্তুতিতে জেগে উঠল। সৈন্যরা ছুটে চলল নিজেদের নির্ধারিত স্থানে। অস্ত্রাগারে ধাতব শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। কামানগুলো ঘুরিয়ে পূর্ব প্রাচীরের দিকে তাক করা হলো। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল যুদ্ধের আগমনী উত্তেজনা।
প্রতাপ দ্রুত পূর্ব প্রাচীরের দিকে রওনা হতে যাচ্ছিল, এমন সময় হঠাৎ রঘুপতি আচার্য তার হাত শক্ত করে চেপে ধরলেন। বৃদ্ধের চোখে এমন এক ভয় ফুটে উঠেছিল, যা প্রতাপ আগে কখনও দেখেনি।
“সাবধানে যেও,” কাঁপা কণ্ঠে বললেন তিনি।
প্রতাপ ভ্রু কুঁচকে তাকাল। “কেন?”
রঘুপতির কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে এল। “কারণ ওরা মোগল নয়।”
প্রতাপ বিস্মিত হয়ে বলল, “তাহলে?”
বৃদ্ধ লোকটি ফিসফিস করে বললেন, “ওরা বিশ্বাস করে যশোরের সিংহাসনের প্রকৃত উত্তরাধিকারী তুমি নও।”
কথাটা যেন বজ্রাঘাতের মতো আঘাত করল প্রতাপের বুকে। কয়েক মুহূর্তের জন্য তার মুখ কঠিন হয়ে গেল। কিন্তু উত্তর দেওয়ার আগেই আবার যুদ্ধের শিঙা বেজে উঠল—এবার আরও কাছে, আরও ভয়ংকর, আরও তীক্ষ্ণ।
আর এক মুহূর্তও দেরি না করে প্রতাপ পূর্ব প্রাচীরের দিকে ছুটল। তার সঙ্গে বসন্ত রায়, নৌসেনাপতি এবং কয়েকশো নির্বাচিত সৈন্য। সবাই দ্রুত প্রাচীরের উপর উঠে দাঁড়াতেই নিচের দৃশ্য দেখে একসঙ্গে থমকে গেল।
মশালের লালচে আলোয় হাজার হাজার সৈন্য নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। প্রত্যেকের পরনে কালো পোশাক। প্রত্যেকের পতাকায় আঁকা একই প্রতীক—একটি কালো সূর্য। সামনের সারিতে অশ্বারোহী বাহিনী, তাদের পেছনে সুসংগঠিত পদাতিক সৈন্য, আর আরও পেছনে সারি সারি বিশাল কামান। পুরো বাহিনীকে দেখে মনে হচ্ছিল, বহু বছর ধরে পৃথিবীর চোখের আড়ালে গোপনে এক পূর্ণাঙ্গ সেনাবাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে।
প্রতাপের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক সেনাপতি বিস্মিত কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল, “এত বড় বাহিনী লুকিয়ে রাখা সম্ভব কীভাবে?”
কেউ কোনো উত্তর দিতে পারল না। কারণ এই প্রশ্নের উত্তর কারও জানা ছিল না।
ঠিক তখনই সৈন্যদল ধীরে ধীরে দুদিকে সরে যেতে শুরু করল। মাঝখানে তৈরি হলো একটি প্রশস্ত পথ। সেই পথ ধরে ধীরগতিতে সামনে এগিয়ে এল একটি কালো ঘোড়া। তার পিঠে বসে আছে এক রহস্যময় মানুষ। মাথা থেকে পা পর্যন্ত কালো বর্মে ঢাকা তার দেহ। মুখের বেশির ভাগ অংশও আবৃত। শুধু চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে। আর সেই চোখে এমন এক বরফশীতল দৃষ্টি—যেন অসংখ্য যুদ্ধ, অসংখ্য মৃত্যু এবং অসংখ্য বিশ্বাসঘাতকতার সাক্ষী সে।
লোকটি প্রাচীরের সামনে এসে ঘোড়া থামাল। কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা নেমে রইল চারদিকে। তারপর সে মাথা তুলে প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে থাকা প্রতাপের দিকে তাকিয়ে উচ্চকণ্ঠে ডাকল, “প্রতাপাদিত্য!”
তার কণ্ঠ এত প্রবল ছিল যে পুরো যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়ল। মুহূর্তের জন্য হাজার হাজার সৈন্যও নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
প্রতাপ ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এসে বলল, “কে তুমি?”
লোকটি কোনো তাড়াহুড়ো করল না। ধীরে ধীরে কোমর থেকে নিজের তরবারিটি বের করল। মশালের আলো তরবারির ফলায় ঝলসে উঠল। তারপর সে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “আমি সেই সত্যের রক্ষক... যেটা তোমার পরিবার শতাব্দী ধরে লুকিয়ে রেখেছে।”
প্রতাপের চোখ সরু হয়ে এল। “নাম বল।”
লোকটি কয়েক মুহূর্ত নীরব রইল। তারপর বলল, “আমার নাম এখন গুরুত্বপূর্ণ নয়।”
সে ধীরে ধীরে আঙুল তুলে যশোর রাজপ্রাসাদের দিকে নির্দেশ করল।
“গুরুত্বপূর্ণ হলো—ওই দেয়ালের ভেতরে একজন মানুষ আছে, যে এই সিংহাসনের প্রকৃত উত্তরাধিকারী নয়।”
তার কথায় প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যদের মধ্যে মুহূর্তেই চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল। প্রতাপের মুঠি শক্ত হয়ে উঠল। তার চোখে আগুন জ্বলে উঠল।
“আর একবার বললে—”
কিন্তু লোকটি তাকে কথা শেষ করার সুযোগই দিল না।
“তোমার পিতা মৃত্যুর আগে সত্যিটা জানতেন।”
বিক্রমাদিত্য!
নামটা শুনতেই প্রতাপের বুকের ভেতর যেন বজ্রপাত হলো। মুহূর্তের মধ্যে তার মনে ভেসে উঠল রক্তমাখা সেই চিরকুট। অস্পষ্ট কয়েকটি শব্দ—“বিশ্বাস করো না...” আর শেষের সেই অসমাপ্ত অক্ষর—“ব...”
সবকিছু আবার তার মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল।
ঠিক তখনই কালো বর্মধারী লোকটি কোমর থেকে একটি বহু পুরনো কাপড় বের করল। ধীরে ধীরে সেটি খুলে সবার সামনে আকাশের দিকে তুলে ধরল।
মশালের আলোয় সবাই স্পষ্ট দেখতে পেল—একটি রাজকীয় প্রতীক।
যশোর রাজবংশের বহুদিন আগে হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন রাজচিহ্ন।
যে প্রতীককে ইতিহাস বহু আগেই মুছে ফেলেছিল।
প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন বৃদ্ধ সভাসদ সেই প্রতীক দেখেই আতঙ্কে এক পা পিছিয়ে গেলেন। একজন কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বললেন, “না...”
আরেকজন স্তব্ধ কণ্ঠে বললেন, “এটা তো... অসম্ভব...”
প্রতাপ দ্রুত ঘুরে তাদের দিকে তাকাল।“তোমরা এটা চেনো?”
কেউ কোনো উত্তর দিল না।
কারণ তাদের মুখে ফুটে ওঠা আতঙ্কই সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিয়েছে।
আর সেই মুহূর্তেই প্রতাপ বুঝতে পারল—আজ রাত শুধু যুদ্ধের রাত নয়। আজ রাত সেই রাত, যে রাতে যশোর রাজ্যের শতবর্ষের গোপন ইতিহাস ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে শুরু করবে।
..................................................... 🔥
পূর্ব প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে থাকা সবাই যেন এক অদৃশ্য ঝড়ের মধ্যে আটকে গেছে। নিচে হাজার হাজার কালো সূর্যের সৈন্য। তাদের হাতে জ্বলতে থাকা মশালের আলোয় রাতের ঘন অন্ধকার রক্তিম আভায় রঙিন হয়ে উঠেছে। সেই বিশাল বাহিনীর ঠিক মাঝখানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রহস্যময় কালো বর্মধারী নেতা। তার হাতে উড়ছে যশোর রাজবংশের বহু শতাব্দী আগে হারিয়ে যাওয়া এক প্রাচীন প্রতীক—যে প্রতীক এতদিন কেবল কিংবদন্তির মধ্যেই বেঁচে ছিল, বাস্তবে যার অস্তিত্ব আছে বলে কেউ আর বিশ্বাস করত না।
প্রতাপাদিত্যের দৃষ্টি ধীরে ধীরে ঘুরে গেল তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ সভাসদদের দিকে। মুহূর্তের মধ্যেই সে বুঝতে পারল, তাদের মুখে যে অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে, তা শুধুই বিস্ময়ের নয়। সেখানে আতঙ্ক আছে, অবিশ্বাস আছে, আর আছে বহু বছরের চাপা পড়ে থাকা এমন এক অপরাধবোধ, যা আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তাদের নীরবতাই যেন সবকিছু বলে দিচ্ছিল।
প্রতাপ গভীর, কঠিন কণ্ঠে বলল, “আমি প্রশ্ন করেছি।”
কিন্তু কেউ উত্তর দিল না। চারদিকে এমন নিস্তব্ধতা নেমে এল যে দূরে নদীর ঢেউয়ের শব্দ পর্যন্ত স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করার পর প্রতাপ হঠাৎ বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠল, “উত্তর চাই!”
তার কণ্ঠের তীব্রতায় প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে থাকা সবাই চমকে উঠল। অবশেষে সবচেয়ে বৃদ্ধ সভাসদ ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলেন। তার হাত কাঁপছে, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, চোখেমুখে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ।
তিনি কাঁপা গলায় বললেন, “রাজপুত্র...”
প্রতাপ এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে প্রশ্ন করল, “এই প্রতীকটা কী?”
বৃদ্ধ লোকটি গভীর শ্বাস নিয়ে নিচের দিকে একবার তাকালেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “এটা যশোর রাজবংশের প্রথম রাজপরিবারের প্রতীক।”
প্রতাপের ভ্রু কুঁচকে গেল। “প্রথম রাজপরিবার?”
“হ্যাঁ,” বৃদ্ধ শান্ত কিন্তু ভারী কণ্ঠে উত্তর দিলেন। “যাদের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা হয়েছিল।”
প্রতাপের বুকের ভেতর যেন হঠাৎ ধক করে উঠল। “মুছে ফেলা হয়েছিল মানে?”
বৃদ্ধ সভাসদ চোখ নামিয়ে নিলেন। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, “ক্ষমতার লড়াই। বহু বছর আগে সিংহাসন নিয়ে এক ভয়ংকর সংঘর্ষ হয়েছিল। সেই সংঘর্ষে যারা জয়ী হয়েছিল, তারাই ইতিহাস লিখেছিল।”
প্রতাপ ধীরস্বরে জিজ্ঞেস করল, “আর পরাজিতরা?”
বৃদ্ধের কণ্ঠ আরও ভারী হয়ে উঠল। “তাদের নাম ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়া হয়েছিল। যেন তাদের কোনোদিন অস্তিত্বই ছিল না।”
চারদিকে আবার নীরবতা নেমে এল। প্রতাপ ধীরে ধীরে দৃষ্টি নামিয়ে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা কালো বর্মধারী নেতার দিকে তাকাল। আশ্চর্যের বিষয়, লোকটি যেন ওপরের প্রতিটি কথাই শুনতে পাচ্ছে। তার চোখে ছিল এক অদ্ভুত স্থিরতা, যেন সে অনেক দিন ধরেই এই মুহূর্তের অপেক্ষায় ছিল।
হঠাৎ সে উচ্চস্বরে ডাকল, “প্রতাপাদিত্য!”
প্রতাপও দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল, “বল!”
লোকটি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “তুমি কি সত্য জানার সাহস রাখো?”
প্রতাপের চোখে তীব্র দীপ্তি জ্বলে উঠল। “আমি মিথ্যার মধ্যে বাঁচতে চাই না।”
কালো বর্মধারী ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। “ভালো।”
এরপর সে নিজের বর্মের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে একটি পুরনো চামড়ার পুঁথি বের করল। পুঁথিটির প্রান্তে সময়ের ক্ষয়ের স্পষ্ট চিহ্ন, তবু মাঝখানে অমলিন অবস্থায় খোদাই করা রয়েছে সেই একই প্রতীক—কালো সূর্য।
পুঁথিটি চোখে পড়তেই প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে থাকা রঘুপতি আচার্যের মুখ মুহূর্তের মধ্যে বিবর্ণ হয়ে গেল। তার ঠোঁট কাঁপতে লাগল। প্রায় ফিসফিস করে তিনি বললেন, “না...”
প্রতাপ সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি লক্ষ্য করল। “আপনি এটা চেনেন?”
রঘুপতি চোখ বন্ধ করলেন। মনে হলো বহু বছরের পুরনো কোনো দুঃস্বপ্ন আবার ফিরে এসেছে। অনেক কষ্টে তিনি বললেন, “চিনি।”
“কী ওটা?”
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিলেন, “ওটাই সেই পুঁথি... যেটাকে আমি ধ্বংস হয়ে গেছে বলে বিশ্বাস করেছিলাম।”
নিচে দাঁড়িয়ে থাকা কালো বর্মধারী তখন মৃদু হেসে উঠল। “ধ্বংস হয়নি, আচার্য। সত্য কখনও পুরোপুরি ধ্বংস হয় না।”
এদিকে বসন্ত রায়ের মুখ ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছিল। আচমকা তিনি সামনে এগিয়ে এসে বজ্রকণ্ঠে বললেন, “এই নাটক যথেষ্ট হয়েছে। ধনুক প্রস্তুত করো!”
তার নির্দেশ পাওয়া মাত্রই প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে থাকা তীরন্দাজরা একসঙ্গে ধনুক তুলে ধরল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কালো বর্মধারী লোকটির মুখে বিন্দুমাত্র ভয় দেখা গেল না। বরং তার ঠোঁটে আরও রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।
সে প্রতাপের দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখলে, প্রতাপ? সত্য প্রকাশের আগেই সে আমাকে চুপ করিয়ে দিতে চায়।”
কথাগুলো প্রতাপের বুকের ভেতর আবার সন্দেহের কাঁটা বিঁধিয়ে দিল। বিক্রমাদিত্যের মৃত্যুর আগে উচ্চারিত শেষ কথাগুলো যেন আবার কানে ভেসে উঠল—“বিশ্বাস করো না... ব...”
প্রতাপের দৃষ্টি ধীরে ধীরে বসন্ত রায়ের দিকে গিয়ে স্থির হলো। এই প্রথম সে নিজের চাচার চোখে এক অস্বস্তি, এক অদ্ভুত দ্বিধা দেখতে পেল। এতদিন যে মানুষটিকে সে অটল ও নির্ভীক বলে জানত, আজ তার মুখেও যেন অজানা উদ্বেগের ছায়া।
ঠিক সেই সময় কালো বর্মধারী লোকটি পুঁথিটি আরও উঁচু করে ধরে গর্জে উঠল, “এই পুঁথির মধ্যে আছে প্রকৃত উত্তরাধিকারীর ইতিহাস!”
চারদিকে মুহূর্তের মধ্যে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।
সে আবার বলল, “আর এই ইতিহাস প্রমাণ করে—”
ইচ্ছে করেই সে বাকিটুকু বলার আগে থেমে গেল। সেই বিরতিটুকুই যেন উপস্থিত সবার উত্তেজনাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল।
তারপর ধীরে ধীরে উচ্চারণ করল, “যে মানুষ আজ যশোরের সিংহাসনের দাবিদার... সে হয়তো প্রকৃত উত্তরাধিকারী নয়।”
কথাটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্য, সভাসদ ও অভিজাতদের মধ্যে প্রবল ফিসফাস শুরু হয়ে গেল। কেউ প্রতাপের দিকে তাকাচ্ছে, কেউ বসন্ত রায়ের দিকে, আবার কেউ রঘুপতি আচার্যের মুখ পড়ার চেষ্টা করছে। মনে হচ্ছিল, এক মুহূর্তের মধ্যেই সবাই যেন একে অপরকে নতুন চোখে দেখতে শুরু করেছে।
ঠিক তখনই দূরে নদীর দিক থেকে ভেসে এল এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণের মতো শব্দ।
ধুমমমম!তারপর আবার—ধুমমমম!
প্রতাপ দ্রুত নদীর দিকে তাকাল। পরের মুহূর্তেই তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। নদীর অন্ধকার বুকের উপর একের পর এক শত শত নতুন মশাল জ্বলে উঠছে। যতদূর চোখ যায়, শুধু জাহাজ... আরও জাহাজ... যেন দিগন্তজোড়া অগ্নিশিখা ধীরে ধীরে যশোরের দিকে এগিয়ে আসছে।
বৃদ্ধ নৌসেনাপতির মুখ মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তিনি শুকনো গলায় ফিসফিস করে বললেন, “এটা... এটা অসম্ভব...”
প্রতাপ দ্রুত তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”
বৃদ্ধ কাঁপা কণ্ঠে বললেন, “ওগুলো মোগল জাহাজ নয়...”
প্রতাপের কণ্ঠ আরও কঠিন হয়ে উঠল। “তাহলে?”
নৌসেনাপতির চোখে এবার স্পষ্ট আতঙ্ক ফুটে উঠল। তিনি ধীরে ধীরে বললেন, “ওগুলো... পর্তুগিজ যুদ্ধজাহাজ।”
এক মুহূর্তের জন্য পুরো পূর্ব প্রাচীর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কারণ বাংলার নদীপথে পর্তুগিজ যুদ্ধজাহাজের এই আকস্মিক আবির্ভাবের অর্থ একটাই—যুদ্ধের দাবার ছকে আরেকটি শক্তিশালী পক্ষ প্রবেশ করেছে।
কিন্তু সেই নতুন শক্তি বন্ধু, না শত্রু—এখনও কেউ জানে না।
....................................................
পূর্ব প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে থাকা সবাই তখন নদীর দিকে তাকিয়ে। রাতের অন্ধকারে শত শত মশাল জ্বলছে। দিগন্তজোড়া জাহাজ। কালো নদীর বুক যেন আগুনের সাগরে পরিণত হয়েছে। বাতাসে ভেসে আসছে অচেনা শিঙার শব্দ। না মোগল, না বাংলার—সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বৃদ্ধ নৌসেনাপতির কণ্ঠ কাঁপছে।“পর্তুগিজ...”
প্রতাপ চোখ সরু করে নদীর দিকে তাকাল।“তুমি নিশ্চিত?”
“হ্যাঁ।”বৃদ্ধ লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মশালের আলোয় তার মুখে পুরোনো স্মৃতির ছাপ ফুটে উঠল।“ওদের জাহাজ আমি ভুলতে পারি না। বহু বছর আগে সমুদ্রে ওদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছি।”
প্রতাপ চুপ করে রইল। তার সামনে এখন তিনটি বিপদ। নদীতে মোগল বাহিনী, পূর্বে কালো সূর্যের সেনা, আর এখন—পর্তুগিজ যুদ্ধজাহাজ।
ঠিক তখনই নিচে দাঁড়িয়ে থাকা কালো বর্মধারী নেতা হেসে উঠল।“দেখছো প্রতাপ?”সে নদীর দিকে আঙুল তুলল।“খেলা আরও বড় হয়ে গেছে।”
প্রতাপ তার দিকে তাকাল।“তুমি কি ওদের ডেকেছ?”
লোকটা সরাসরি উত্তর দিল না। ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে শুধু বলল,“যখন একটা রাজ্য দুর্বল হয়... তখন শকুনেরা নিজেরাই এসে যায়।”
বসন্ত রায়ের মুখ কঠিন হয়ে উঠল। তিনি এক ঝটকায় তলোয়ার বের করলেন।“আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট নয়। ওকে বন্দি করো!”
সঙ্গে সঙ্গে তীরন্দাজরা ধনুক টানল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই নদীর বুক থেকে একটা বিশাল কামান গর্জে উঠল।
ধুমমমম!
আকাশ কেঁপে উঠল। একটা জ্বলন্ত গোলা সরাসরি নদীর তীরের পরিত্যক্ত প্রহরী মিনারে আঘাত করল। মুহূর্তের মধ্যে ভয়ংকর বিস্ফোরণ ঘটল। আগুন আর ধোঁয়ায় চারপাশ ঢেকে গেল। প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে থাকা অনেক সৈন্য ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেল।
আর সেই বিশৃঙ্খলার সুযোগে কালো বর্মধারী নেতা নিজের ঘোড়াকে ঘুরিয়ে দিল।“আজ না, প্রতাপাদিত্য। কিন্তু খুব শীঘ্রই আবার দেখা হবে।”
সে হাত তুলতেই কালো সূর্যের হাজারো সৈন্য একসঙ্গে শিঙা বাজাল। ভয়ংকর সেই শব্দ রাতের আকাশ কাঁপিয়ে দিল। তারপর তারা ধীরে ধীরে পিছু হটতে শুরু করল।
প্রতাপ বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।“ওরা চলে যাচ্ছে?”
বৃদ্ধ নৌসেনাপতি ভ্রু কুঁচকে বললেন,“না।”
“তাহলে?”
“ওরা অপেক্ষা করছে।”
প্রতাপ বুঝতে পারল। কালো সূর্য বাহিনী যুদ্ধ করতে আসেনি—আজ অন্তত নয়। তারা এসেছে শুধু একটি বার্তা দিতে। আর সেই বার্তা ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছে।
ঠিক তখনই নদীর দিক থেকে কয়েকটা ছোট নৌকা আলাদা হয়ে তীরের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করল। প্রহরীরা সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে উঠল।
“শত্রু?”
“আক্রমণ?”
সবাই অস্ত্র তুলে ধরল। কিন্তু নৌকাগুলোর মাথায় সাদা পতাকা উড়ছে—শান্তির পতাকা।
প্রতাপের চোখ সরু হয়ে এলো।“এবার কী?”
কিছুক্ষণ পর প্রথম নৌকাটা তীরে ভিড়ল। সেখান থেকে নামল একজন লম্বা মানুষ। ফর্সা গাত্রবর্ণ, ঘন দাড়ি, অদ্ভুত পোশাক, কোমরে সরু তলোয়ার। বৃদ্ধ নৌসেনাপতি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, “পর্তুগিজ।”
লোকটা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এল। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন সশস্ত্র সৈনিক ছিল, কিন্তু তারা যুদ্ধের ভঙ্গিতে নয়; বরং দূতের মতো শান্তভাবে এগিয়ে আসছিল।
লোকটা ভাঙা বাংলায় বলল, “মহারাজ প্রতাপাদিত্য কে?”
প্রতাপ সামনে এগিয়ে এল।“আমি।”
লোকটা মাথা নত করল। তারপর নিজের পোশাকের ভেতর থেকে একটা সিলমোহর করা চিঠি বের করে প্রতাপের হাতে দিল।“আমাদের অধিনায়ক আপনাকে এটা পাঠিয়েছেন।”
প্রতাপ চিঠিটা হাতে নিল। মোমের সিলে একটা অদ্ভুত প্রতীক খোদাই করা। না মোগল, না কালো সূর্য, না যশোর রাজবংশের চিহ্ন। একটা নোঙরকে ঘিরে ক্রুশচিহ্ন।
সে ধীরে ধীরে সিল ভাঙল। চিঠি খুলে পড়তে শুরু করল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তার চোখের দৃষ্টি বদলে গেল। প্রথমে বিস্ময়, তারপর সন্দেহ, তারপর—অবিশ্বাস।
বসন্ত রায় এগিয়ে এলেন।“কী লেখা আছে?”
প্রতাপ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। চারপাশ নিস্তব্ধ। উপস্থিত সবাই তার উত্তরের অপেক্ষায়।
অবশেষে সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল।“পর্তুগিজরা জোট চাইছে।”
চারদিকে ফিসফাস শুরু হয়ে গেল। কিন্তু প্রতাপের পরের কথায় সব শব্দ মুহূর্তেই থেমে গেল।“আর তারা দাবি করছে...”
সে চিঠিটার দিকে আরেকবার তাকাল, যেন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছে না।“তাদের কাছে এমন একজন বন্দি আছে, যে আমার জন্ম সম্পর্কে সব সত্য জানে।”
মুহূর্তের মধ্যে বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল। বসন্ত রায়ের মুখ কঠিন হয়ে গেল। রঘুপতি আচার্যের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল। আর প্রতাপ অনুভব করল, যে রহস্য এতদিন তাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করে এসেছে, তার বন্ধ দরজাটা হয়তো অবশেষে খুলতে চলেছে।
............................................................
রাত আরও গভীর হয়েছে।
যশোরের আকাশে এখনও ধোঁয়া আর আগুনের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। পূর্ব প্রাচীরের বাইরে কালো সূর্যের বাহিনী নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নিয়ে অপেক্ষা করছে। নদীর বুকে অন্ধকারে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে মোগল যুদ্ধজাহাজগুলো। তারই মধ্যে এসে পৌঁছেছে পর্তুগিজ নৌবহর। যেন চারদিক থেকে একটি অদৃশ্য ফাঁস ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে যশোরকে গ্রাস করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কিন্তু প্রতাপাদিত্যের মনে এই মুহূর্তে যুদ্ধের থেকেও বড় এক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। তাদের কাছে এমন একজন বন্দি আছে, যে আমার জন্ম সম্পর্কে সব সত্য জানে।চিন্তাটা তার মনের ভেতর বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
প্রাচীরের ওপর ভারী নীরবতা নেমে এলো। বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। সেই নীরবতার মধ্যেই বসন্ত রায় ধীরে ধীরে বললেন,— চিঠিটা আমাকে দেখাও।
প্রতাপ কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না। তার দৃষ্টি স্থির ছিল দূরের অন্ধকার নদীর দিকে। তারপর ধীরে ধীরে চিঠিটা বাড়িয়ে দিল।
বসন্ত রায় মনোযোগ দিয়ে পড়তে শুরু করলেন। প্রথম কয়েকটি লাইন পড়ার পরই তার মুখের রঙ সামান্য বদলে গেল। এতটাই সামান্য যে সাধারণ কারও চোখে হয়তো ধরা পড়ত না। কিন্তু প্রতাপ সেই সূক্ষ্ম পরিবর্তনটি স্পষ্টই লক্ষ্য করল।
তার সন্দেহ আরও গভীর হলো। সে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল, "আপনি লোকটার নাম জানেন?
বসন্ত রায় মাথা তুলে তার দিকে তাকালেন।— না।
উত্তরটা এল অস্বাভাবিক দ্রুত। যেন আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। প্রতাপ আর কিছু বলল না। তবে মনে মনে উত্তরটা গেঁথে রাখল।
ঠিক সেই সময় রঘুপতি আচার্য সামনে এগিয়ে এলেন।— চিঠিতে বন্দির নাম লেখা আছে?
— আছে।
— কে?
প্রতাপ ধীরে ধীরে উচ্চারণ করল, "ঈশান ভট্ট।"
নামটা উচ্চারণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন বজ্রাঘাত হলো।রঘুপতি আচার্যের সমগ্র শরীর কেঁপে উঠল। তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে তিনি ফিসফিস করে বললেন, "অসম্ভব..."
প্রতাপের দৃষ্টি মুহূর্তেই তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।— আপনি চেনেন?
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলেন। মনে হলো বহু বছরের পুরোনো স্মৃতি হঠাৎ ফিরে এসেছে।
অবশেষে তিনি ধীরে ধীরে বললেন, "চিনি।"
প্রতাপের কণ্ঠে উৎকণ্ঠা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।— কে সে?
রঘুপতি আচার্য গভীর শ্বাস নিলেন। তারপর ধীর, ভারী কণ্ঠে বললেন, "বহু বছর আগে রাজপরিবারের সমস্ত গোপন ইতিহাস লিখে রাখার দায়িত্ব ছিল যার ওপর... সেই মানুষটাই ঈশান ভট্ট।"
প্রতাপের বুকের ভেতর ধক করে উঠল।— ইতিহাসরক্ষক?
— হ্যাঁ।
— তাহলে সে সব জানে?
রঘুপতি ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।— যদি সে এখনও জীবিত থাকে... তাহলে বাংলায় তার চেয়ে বেশি আর কেউ জানে না।
আবার নেমে এলো গভীর নীরবতা। প্রতাপ নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। দূরে পর্তুগিজ জাহাজগুলোর মশাল অন্ধকারের মধ্যে দপদপ করে জ্বলছে।
হয়তো সেই জাহাজগুলোর কোনো একটিতে বন্দি হয়ে আছে এমন একজন মানুষ, যার কাছে লুকিয়ে রয়েছে তার জন্মের রহস্য, রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস এবং বহু বছরের চাপা সত্য।
ঠিক তখনই একজন সৈন্য দ্রুত ছুটে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে প্রণাম করল।— রাজপুত্র!
প্রতাপ ঘুরে তাকাল।— কী হয়েছে?
— পর্তুগিজ দূত আবার এসেছে।
প্রতাপ ভ্রু কুঁচকে বলল,— এত দ্রুত?
— হ্যাঁ, রাজপুত্র।
— কী চায়?
সৈন্যটি দুই হাতে একটি ছোট কাঠের বাক্স এগিয়ে দিল।
— এটা দিয়ে গেছে।
প্রতাপ বাক্সটি হাতে নিল। আকারে ছোট হলেও অস্বাভাবিক ভারী। গায়ে সূক্ষ্ম কারুকাজে অদ্ভুত সব নকশা খোদাই করা। কাঠটাও সাধারণ নয়, বহু বছরের পুরোনো বলে মনে হচ্ছে।
সে ধীরে ধীরে ঢাকনাটি খুলল। আর পরের মুহূর্তেই তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। ভেতরে রাখা আছে একটি পুরোনো রূপার লকেট। লকেটের গায়ে খোদাই করা রয়েছে যশোর রাজপরিবারের রাজচিহ্ন।
কিন্তু সেটাই সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল না। প্রতাপ কাঁপা হাতে লকেটটি খুলল। ভেতরে একটি বিবর্ণ প্রতিকৃতি।একজন যুবতীর মুখ। মুহূর্তের মধ্যে প্রতাপের নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে এল। এই মুখ সে চেনে। খুব ভালো করেই চেনে।
প্রাসাদের পুরোনো প্রতিকৃতিতে অসংখ্যবার দেখেছে।নিজের শয়নকক্ষের দেয়ালে টাঙানো ছবিতেও প্রতিদিন দেখেছে। তিনি...তার মা।
ঘরের ভেতর মুহূর্তেই নিস্তব্ধতা নেমে এলো। বসন্ত রায়ের হাত কাঁপতে শুরু করল। রঘুপতি আচার্য এক পা পিছিয়ে গেলেন, যেন বহু বছরের চাপা কোনো সত্য হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
লকেটের নিচে ভাঁজ করে রাখা ছিল একটি ছোট্ট কাগজ। প্রতাপ সেটি খুলল। মাত্র একটি লাইন লেখা—"এটা প্রমাণের প্রথম অংশ। দ্বিতীয় অংশ দেখতে চাইলে আগামী পূর্ণিমার রাতে একা এসো।"
প্রতাপের বুকের ভেতর অজানা আশঙ্কা জমতে শুরু করল। কিন্তু নিচে আরও একটি লাইন ছিল। সেই লাইনটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন তার সমগ্র পৃথিবী কেঁপে উঠল।"তোমার মায়ের মৃত্যু যেমন বলা হয়েছে, সত্যিটা তেমন নয়।"
চারদিকে গভীর নিস্তব্ধতা। দূরে কোথাও রাতের এক পাখি ডেকে উঠল। কিন্তু প্রতাপ যেন কিছুই শুনতে পেল না। তার জীবনের সবচেয়ে অকাট্য, সবচেয়ে নিশ্চিত সত্যটাকেই কেউ এই প্রথম প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
আর সেই মুহূর্তে সে অনুভব করল—সিংহাসনের রহস্যের চেয়েও ভয়ংকর, গভীর কোনো অন্ধকার বহু বছর ধরে লুকিয়ে রয়েছে তার নিজের পরিবারের অতীতের মধ্যে।
সেই অন্ধকারের দরজা আজ প্রথমবারের মতো অল্প একটু খুলে গেল।
..............................................................
রাতের বাতাস যেন হঠাৎ আরও ঠান্ডা হয়ে উঠল।প্রতাপাদিত্যের হাতে এখনও সেই পুরনো রূপার লকেট। মশালের কাঁপা আলোয় তার মায়ের বিবর্ণ প্রতিকৃতিটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
আর সেই কাগজের শেষ লাইন—"তোমার মায়ের মৃত্যু যেমন বলা হয়েছে, সত্যিটা তেমন নয়।"
এই কয়েকটি শব্দ যেন তার বুকের ভেতর ঝড় তুলেছে। কারণ ছোটবেলা থেকে সে একটাই কথা জেনে এসেছে। তার মা অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছিলেন।এটাই ছিল সরকারি ইতিহাস। এটাই ছিল পরিবারের গল্প। এটাই ছিল সত্য।
কিন্তু যদি সেটা সত্য না হয়? যদি এত বছর ধরে তাকে মিথ্যা বলা হয়ে থাকে? প্রতাপ ধীরে ধীরে মাথা তুলল।তার চোখ গিয়ে থামল বসন্ত রায়ের মুখে। কাকার মুখ অস্বাভাবিক ফ্যাকাসে। হয়তো আগুনের আলোয় এমন লাগছে। হয়তো না।
“আপনি কিছু জানেন?”
প্রশ্নটা শুনে চারপাশ আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। বসন্ত রায় কয়েক মুহূর্ত কোনো উত্তর দিলেন না। তারপর ধীরে ধীরে বললেন—“তোমার মায়ের মৃত্যুর বিষয়ে যা জানার, তুমি সব জানো।”
প্রতাপ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। “তাহলে এই চিঠি দেখে আপনি বিচলিত হলেন কেন?”
বসন্ত রায়ের চোখে বিরক্তির ঝলক দেখা দিল।“একটা অচেনা শত্রুর লেখা চিঠিকে আমি সত্য বলে মেনে নেব কেন?”
কথাটা যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু প্রতাপের মনে হলো—উত্তরটা যেন প্রস্তুত করা। যেন আগে থেকেই ভেবে রাখা।ঠিক তখনই রঘুপতি আচার্য নিচু গলায় বললেন—“সব সত্য মিথ্যা নয়... আর সব মিথ্যাও পুরো মিথ্যা নয়।”
বসন্ত রায় সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকালেন। দুজনের চোখে চোখ পড়ল। আর প্রতাপ আবার সেই অদ্ভুত উত্তেজনা অনুভব করল। যেন এই দুই বৃদ্ধ মানুষ বহু বছরের কোনো গোপন যুদ্ধ লড়ছেন। ঠিক তখনই—নদীর দিক থেকে এক ভয়ংকর বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে এলো।
ধুমমমম!তারপর আরেকটা।ধুমমমম!
প্রাচীর কেঁপে উঠল। সৈন্যরা চমকে উঠল। একজন প্রহরী দৌড়ে এলো।“রাজপুত্র!”
“কী হয়েছে?”
“পর্তুগিজরা নদীতে কামান ছুঁড়ছে!”
প্রতাপ বিস্মিত হয়ে বলল—“আমাদের দিকে?”
“না।”
“তাহলে?”
“মোগল জাহাজের দিকে!”
কয়েক মুহূর্ত সবাই স্তব্ধ হয়ে রইল। বৃদ্ধ নৌসেনাপতি অবিশ্বাসে বললেন—“পর্তুগিজরা মোগলদের আক্রমণ করছে?”
প্রতাপ দ্রুত নদীর দিকে তাকাল। দূরে আগুনের ফুলকি দেখা যাচ্ছে। মাঝনদীতে কয়েকটা জাহাজে আগুন লেগেছে।
চিৎকার।কামানের গর্জন।ধোঁয়া।
মনে হচ্ছে হঠাৎ করেই নদীর বুক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। কিন্তু কেন? পর্তুগিজরা কি সত্যিই সাহায্য করতে এসেছে? নাকি এর পেছনেও অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে? ঠিক তখনই সেই পর্তুগিজ দূত আবার সামনে এগিয়ে এল। সে মাথা নত করল।
“মহারাজ।”
প্রতাপ ঠান্ডা গলায় বলল—“এবার কী?”
লোকটা উত্তর দিল—“আমাদের অধিনায়ক আপনাকে একটি বার্তা পাঠিয়েছেন।”
“বল।”
“তিনি বলেছেন—প্রথম উপহার দেওয়া হয়েছে।”
প্রতাপ ভ্রু কুঁচকাল।
“উপহার?”
দূত নদীর দিকে তাকাল। যেখানে মোগল জাহাজগুলো আগুনে জ্বলছে।
“ওটাই প্রথম উপহার।”
প্রতাপের চোখ সরু হয়ে এলো। লোকটা আবার বলল—“দ্বিতীয় উপহার আরও মূল্যবান।”
“কী সেটা?”
দূত কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বলল—“ঈশান ভট্ট।”
চারদিকে আবার নিস্তব্ধতা।
“সে জীবিত।”
“কোথায়?”
“আমাদের জাহাজে।”
প্রতাপের বুকের ভেতর ধক করে উঠল। এতদিন যে মানুষটাকে প্রায় কিংবদন্তি বলে মনে হচ্ছিল—সে নাকি সত্যিই বেঁচে আছে? ঠিক তখনই দূত তার পোশাকের ভেতর থেকে আরেকটা জিনিস বের করল। একটা ছোট চামড়ার থলি। সে থলিটা প্রতাপের হাতে দিল।
“এটাও তিনি পাঠিয়েছেন।”
প্রতাপ ধীরে ধীরে থলি খুলল। আর পরের মুহূর্তে তার নিঃশ্বাস আটকে গেল। ভেতরে একটা সোনার আংটি।খুব পুরনো। কিন্তু অদ্ভুতভাবে পরিচিত। কারণ আংটির ভেতরের অংশে খোদাই করা আছে মাত্র দুটি অক্ষর—"ভ""র"রঘুপতি আচার্য আংটিটা দেখেই ফ্যাকাসে হয়ে গেলেন। বসন্ত রায়ের চোখও বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল।প্রতাপ তীক্ষ্ণ গলায় বলল—“এই আংটি কার?”
কেউ উত্তর দিল না। কিন্তু তাদের মুখের অভিব্যক্তিই বলে দিল—তারা দুজনেই নামটা জানে। আর সেই নাম উচ্চারণ করা মাত্র হয়তো বহু বছরের গোপন ইতিহাস ভেঙে পড়বে।
দূরে নদীর উপর আবার কামান গর্জে উঠল। আর প্রতাপ অনুভব করল—সত্য তার খুব কাছে চলে এসেছে। কিন্তু সেই সত্য হয়তো তার পুরো পৃথিবীটাই বদলে দিতে চলেছে। 🔥
...........................................................
রাতের আকাশে আগুনের প্রতিফলন। নদীর বুকে কামানের গর্জন। আর যশোর রাজপ্রাসাদের প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে প্রতাপাদিত্য অনুভব করছিল—তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়তো খুব কাছে চলে এসেছে।
তার হাতে সেই সোনার আংটি। খুব পুরনো। কিন্তু এই ছোট্ট ধাতব বৃত্তটা যেন বহু বছরের গোপন ইতিহাস নিজের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে।
আংটির ভেতরে খোদাই করা—"ভ", "র"
প্রতাপ ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন রঘুপতি আচার্য। পাশে বসন্ত রায়। দুজনের মুখেই অদ্ভুত পরিবর্তন। একজনের চোখে ভয়। আরেকজনের চোখে দমিয়ে রাখা উদ্বেগ।
প্রতাপ ঠান্ডা গলায় বলল—“এই আংটি কার?”
নীরবতা। কেউ উত্তর দিল না। প্রতাপ আবার বলল—“আমি উত্তর চাই।”
বসন্ত রায় মুখ ফিরিয়ে নিলেন। রঘুপতি চোখ বন্ধ করলেন। যেন বহু বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা কোনো স্মৃতি আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
অবশেষে বৃদ্ধ আচার্য ধীরে ধীরে বললেন—“এই আংটি আমি শেষ দেখেছিলাম প্রায় ত্রিশ বছর আগে।”
প্রতাপের বুকের ভেতর ধক করে উঠল।“কার হাতে?”
রঘুপতি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।তারপর উত্তর দিলেন—“ভবানন্দ রায়ের হাতে।”
বাতাস যেন হঠাৎ থেমে গেল। প্রতাপ ভ্রু কুঁচকাল।নামটা তার পরিচিত নয়। কিন্তু বসন্ত রায়ের মুখ মুহূর্তেই পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। প্রতাপ সেটা লক্ষ্য করল।
“ভবানন্দ রায় কে ছিলেন?”
রঘুপতি উত্তর দেওয়ার আগেই বসন্ত রায় গর্জে উঠলেন—“যথেষ্ট হয়েছে!”
সবাই চমকে উঠল। বসন্ত রায়ের কণ্ঠে এমন উত্তেজনা আগে কেউ শোনেনি।
“অতীত খুঁড়ে কোনো লাভ নেই।”
প্রতাপ ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।“তাহলে আপনি ভয় পাচ্ছেন কেন?”
কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে নিস্তব্ধতা নেমে এল। বসন্ত রায়ের চোখে আগুন জ্বলে উঠল।কিন্তু তিনি উত্তর দিলেন না। রঘুপতি ধীরে ধীরে বললেন—“ভবানন্দ রায় ছিলেন রাজপরিবারের একজন সদস্য।”
“তারপর?”
“তিনি একদিন হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যান।”
“অদৃশ্য?”
“সরকারি ইতিহাস তাই বলে।”
প্রতাপ অনুভব করল—আবার সেই একই গল্প। আবার কোনো গোপন সত্য। আবার কোনো মুছে দেওয়া নাম।ঠিক তখনই নদীর দিক থেকে একটা ছোট নৌকা দ্রুত তীরের দিকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল।
সাদা পতাকা উড়ছে। পর্তুগিজ দূত। কিন্তু এবার সে একা নয়।তার সঙ্গে আরও দুজন মানুষ। প্রতাপের চোখ সরু হয়ে এল।
নৌকাটা তীরে ভিড়ল। দূত দ্রুত উঠে এল প্রাচীরের নিচে। তার মুখে তীব্র উত্তেজনা।
“মহারাজ!”
“কী হয়েছে?”
“আমাদের অধিনায়ক এখনই আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান।”
“এখন?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
দূত কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বলল—“কারণ বন্দি মানুষটা আর বেশিক্ষণ বাঁচবে না।”
প্রতাপের বুক কেঁপে উঠল।“ঈশান ভট্ট?”
“হ্যাঁ।”
চারদিকে ফিসফাস ছড়িয়ে পড়ল। রঘুপতি আচার্যের মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
“না...”
প্রতাপ দ্রুত বলল—“কী হয়েছে তার?”
দূত গম্ভীর গলায় বলল—“বিষ দেওয়া হয়েছে।”
মুহূর্তের মধ্যে পুরো প্রাচীর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। প্রতাপের চোখে বিস্ময়।
“কে দিয়েছে?”
দূত মাথা নেড়ে বলল—“সে কিছু বলছে না।”
“আর কতক্ষণ বাঁচবে?”
“সম্ভবত আজ রাত।”
প্রতাপ এক মুহূর্তও দেরি করল না।“ঘোড়া প্রস্তুত করো।”
বসন্ত রায় সঙ্গে সঙ্গে সামনে এলেন।“না।”
প্রতাপ তাকাল।“মানে?”
“তুমি কোথাও যাবে না।”
“কেন?”
“এটা ফাঁদ হতে পারে।”
প্রতাপের কণ্ঠ শক্ত হয়ে উঠল।“আর যদি সত্যি হয়?”
“তবুও না।”
দুজনের চোখে চোখ পড়ল। কয়েক মুহূর্ত। নীরব।উত্তেজনাপূর্ণ। তারপর প্রতাপ ধীরে ধীরে বলল—“আমি যাচ্ছি।”
বসন্ত রায় উত্তর দিলেন—“আমি তোমাকে যেতে দেব না।”
বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। আর ঠিক তখনই—প্রাচীরের পশ্চিম দিক থেকে আতঙ্কিত চিৎকার ভেসে এলো।
“শত্রু!”
“শত্রু ঢুকে পড়েছে!”
সবাই ঘুরে তাকাল। একজন রক্তাক্ত সৈন্য দৌড়ে আসছে। তার শরীর ক্ষতবিক্ষত। মুখে আতঙ্ক। সে হাঁপাতে হাঁপাতে সামনে এসে পড়ে গেল। প্রতাপ তাকে ধরে ফেলল।“কী হয়েছে?”
সৈন্যটা কষ্টে চোখ খুলল। তারপর কাঁপা গলায় বলল—“গোপন সুড়ঙ্গ...”
প্রতাপের বুক ধক করে উঠল। “কী হয়েছে সুড়ঙ্গে?”
সৈন্যটা রক্ত কাশল। তারপর শেষ শক্তিটুকু দিয়ে বলল—“সুড়ঙ্গের ভেতরে... আরেকটা বাক্স পাওয়া গেছে...”
“তারপর?”
সৈন্যটার চোখ ভয়ংকর আতঙ্কে বড় হয়ে গেল।“বাক্সের ভেতরে একটা কঙ্কাল...”
চারদিকে নিস্তব্ধতা।“আর তার গলায় ঝুলছিল একটা ফলক...”
প্রতাপের শ্বাস ভারী হয়ে উঠল।“কী লেখা ছিল?”
সৈন্যটা ফিসফিস করে বলল—"ভবানন্দ রায়"
পরের মুহূর্তেই তার মাথা একপাশে কাত হয়ে গেল।সে মারা গেছে। আর প্রতাপ অনুভব করল—ত্রিশ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া একজন মানুষের ছায়া আবার ফিরে এসেছে। আর সেই ছায়া হয়তো যশোর রাজ্যের পুরো ইতিহাসটাই বদলে দিতে চলেছে। 🔥 ......................................................
পশ্চিম প্রাচীরের কাছে তখন মৃত্যু আর রহস্য পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। রক্তাক্ত সৈন্যটার নিথর দেহ মাটিতে পড়ে আছে। চারপাশে মশালের আলো কাঁপছে। আর প্রতাপাদিত্যের মাথার ভেতর ঘুরছে একটাই নাম—ভবানন্দ রায়।
ত্রিশ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া মানুষ। যার নাম শুনে বসন্ত রায়ের মুখ বদলে যায়। যার আংটি পাওয়া গেছে। আর এখন—যার কঙ্কাল নাকি লুকিয়ে রাখা ছিল গোপন সুড়ঙ্গের ভেতরে। প্রতাপ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার চোখ দুটো এখন অস্বাভাবিক কঠিন।
“সুড়ঙ্গে আমাকে নিয়ে চলো।”
কয়েকজন সৈন্য একে অপরের দিকে তাকাল। বসন্ত রায় সামনে এগিয়ে এলেন।“এখন না।”
প্রতাপ ঘুরে তাকাল।“কেন?”
“কারণ শত্রুরা চারদিক থেকে ঘিরে আছে।”
“আর সেই কারণেই এখনই যেতে হবে।”
বসন্ত রায়ের চোখে বিরক্তি ফুটে উঠল।“তুমি আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছ।”
প্রতাপ ঠান্ডা গলায় বলল—“আর আপনি ভয় দিয়ে।”
দুজনের মধ্যে আবার সেই অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল। অবশেষে রঘুপতি আচার্য ধীরে ধীরে বললেন—“ওকে যেতে দাও।”
বসন্ত রায় তার দিকে তাকালেন।“তুমি বুঝতে পারছ কী বলছ?”
“হ্যাঁ।”রঘুপতির গলায় ক্লান্তি।“অনেক দেরি হয়ে গেছে, বসন্ত। সত্যকে আর আটকে রাখা যাবে না।”
কথাটা শুনে বসন্ত রায়ের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। কিন্তু তিনি আর কিছু বললেন না। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রতাপ, রঘুপতি, কয়েকজন বিশ্বস্ত সৈন্য এবং বৃদ্ধ নৌসেনাপতি গোপন সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখে পৌঁছাল।এটাই সেই সুড়ঙ্গ—যেটা বিক্রমাদিত্যের ব্যক্তিগত কক্ষের পেছনে লুকানো ছিল।
ভেতরে অন্ধকার। স্যাঁতসেঁতে বাতাস। দেয়ালের গায়ে শ্যাওলা। মশালের আলোয় ছায়াগুলো অদ্ভুতভাবে নড়ছে। যেন অন্ধকারের মধ্যেই কেউ লুকিয়ে আছে।
একজন সৈন্য নিচু গলায় বলল—“এখানে অদ্ভুত গন্ধ।”
প্রতাপও টের পেল। পুরনো মাটি। পচা কাঠ। আর তার সঙ্গে মিশে আছে মৃত্যুর গন্ধ। তারা ধীরে ধীরে এগোতে লাগল। প্রতিটি পদক্ষেপের শব্দ সুড়ঙ্গের ভেতর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।টক...
টক...টক...
কিছু দূর যাওয়ার পর পথটা হঠাৎ চওড়া হয়ে গেল।সামনে একটা ছোট পাথরের কক্ষ। আর কক্ষের মাঝখানে—একটা লোহার বাক্স। খোলা। তার চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন প্রহরী।
প্রতাপ এগিয়ে গেল। আর পরের মুহূর্তে তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। কারণ বাক্সের ভেতরে সত্যিই একটা কঙ্কাল রয়েছে। মানুষের কঙ্কাল। বহু বছরের পুরনো।কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—তার গলায় ঝুলছে একটা ব্রোঞ্জের ফলক।
মশালের আলোয় লেখা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।"ভবানন্দ রায়"
কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বলল না। তারপর রঘুপতি আচার্য ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলেন। তার মুখে এমন এক শোক ফুটে উঠল—যেন বহু বছর পর হারিয়ে যাওয়া কাউকে ফিরে পেয়েছেন।
“হে ঈশ্বর...” তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।“তাহলে সত্যিই ওকে হত্যা করা হয়েছিল...”
প্রতাপ দ্রুত তার দিকে তাকাল।“আপনি জানতেন?”
রঘুপতি চোখ বন্ধ করলেন।“আমি সন্দেহ করতাম।”
“কার উপর?”
বৃদ্ধ লোকটা উত্তর দেওয়ার আগে হঠাৎ থেমে গেলেন।কারণ তার চোখ গিয়ে পড়েছে কঙ্কালের ডান হাতে।সেখানে কিছু একটা আটকে আছে। খুব শক্ত করে ধরা। মৃত্যুর মুহূর্তেও ছাড়েনি।
প্রতাপ নিচু হয়ে সেটা বের করল। এক টুকরো কাপড়।পুরনো। বিবর্ণ। কিন্তু তার উপর এখনও কিছু নকশা দেখা যাচ্ছে।
বৃদ্ধ নৌসেনাপতি সেটা দেখেই বিস্ময়ে বলে উঠলেন—“এটা তো...”
“কী?”
লোকটা শুকনো গলায় বলল—“রাজপরিবারের বিশেষ পোশাকের অংশ।”
প্রতাপের বুকের ভেতর ধক করে উঠল। কিন্তু তার থেকেও ভয়ংকর ছিল কাপড়টার কোণে সেলাই করা একটি চিহ্ন। একটি অক্ষর। বাংলা বর্ণমালার একটি মাত্র অক্ষর।'ব'
সবার মুখে আতঙ্ক। কারণ বিক্রমাদিত্যের মৃত্যুর আগে লেখা সেই অসমাপ্ত বার্তাতেও ছিল—'ব...'
প্রতাপ অনুভব করল তার হাত ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে যাচ্ছে। এটা কি কাকতালীয়? নাকি একই মানুষের দিকে ইঙ্গিত?
ঠিক তখনই—সুড়ঙ্গের গভীর অন্ধকার থেকে একটা শব্দ ভেসে এলো।
খস...খস...খস...
সবাই ঘুরে তাকাল। সৈন্যরা তরবারি বের করে ফেলল।মশালের আলো অন্ধকারে ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু কিছু দেখা গেল না। তারপর আবার—খস...খস...
আরও কাছে। আরও স্পষ্ট। যেন কেউ টেনে টেনে হাঁটছে। রঘুপতি আচার্যের মুখ হঠাৎ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তার ঠোঁট কাঁপতে লাগল।“না...”
প্রতাপ বিস্ময়ে তাকাল।“কি হয়েছে?”
বৃদ্ধ লোকটা আতঙ্কিত চোখে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন—“এটা অসম্ভব...”
“কী অসম্ভব?”
রঘুপতির কণ্ঠ শুকিয়ে গেল।“এই শব্দটা আমি আগে শুনেছি...”
নীরবতা।
“কোথায়?”
বৃদ্ধ লোকটার চোখে তখন নিখাদ ভয়।“ত্রিশ বছর আগে...”“ভবানন্দ রায়ের মৃত্যুর রাতে।”
মশালের আগুন কেঁপে উঠল। আর সুড়ঙ্গের গভীর অন্ধকারে—কিছু একটা নড়ল। 🔥চলবে....................