Room Number Thirteen in Bengali Horror Stories by Debojyoti Banerjee books and stories PDF | তেরো নম্বর ঘর - পর্ব 9

Featured Books
Categories
Share

তেরো নম্বর ঘর - পর্ব 9

সেই রাতের পর অনুব্রত বহু মাস অসুস্থ ছিল। তারপর অনুব্রত কলকাতায় চলে গিয়েছিলো।

সে ভেবেছিল, সব ভুলে গেছে। কিন্তু সে ভুলে যায়নি। তার মনের গভীরে সেই রাতের স্মৃতি চাপা পড়ে ছিল।

"আমি কুসুমকে মারিনি," অনুব্রত কাঁদতে কাঁদতে বললো ।

কুসুম তার দিকে তাকালো ।

এবার কুসুম বললো  , "না। তুমি আমাকে মারোনি। তুমি শুধু দরজা বন্ধ করেছিলে।"

"তাহলে তুমি এত বছর ধরে... আমাকে খুজছিলে?" , অনুব্রত বললো ।

কুসুমের মুখে এবার আর কোনো হাসি নেই।

কুসুম গম্ভীর গলায় বললো , "আমি জানতাম, তুমি ফিরে আসবে।"

অনুব্রত  বললো  , "কেন?"

কুসুম বললো  , "কারণ এই বাড়িতে যে একবার নিজের পাপ রেখে যায়, সে যত দূরেই চলে যাক, পাপ তার পিছু ছাড়ে না।"

ইন্সপেক্টর অনিকেত এবার পিস্তল নামিয়ে ফেললো ।

তিনি বুঝতে পারছিলেন না, যা ঘটছে তা বাস্তব, নাকি কোনো সম্মিলিত উন্মাদনা।

কুসুম এবার অনুব্রতর দিকে হাত বাড়ালো।

কুসুম বললো  , "চলো।"

অনুব্রত বললো  , "কোথায়?"

কুসুম বললো  , "যেখানে তোমার মা এতদিন ধরে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।"

অনুব্রত পিছিয়ে গেলো।

অনুব্রত বললো  "আমার মা তো এখানে!"

কুসুম মৃদু হেসে বললো , "তুমি যাঁকে দেখছ, তিনি তোমার মা নন।"

তারপর কুসুম মৃণালিনী দেবীর দিকে তাকিয়ে বললো  , "তাই তো, মৃণালিনী দেবী?"

মৃণালিনী দেবী মাথা নিচু করলো এবং তারপর বললো  , "আমি দুঃখিত, কুসুম।"

কুসুম অবাক হয়ে বললো ,  "দুঃখিত?"

কুসুমের গলা হঠাৎ ভয়ংকর হয়ে উঠল।

কুসুম রাগ আর হতাশায় ভরা কণ্ঠে বললো  , "চল্লিশ বছর ধরে আমি এই বাড়ির দেওয়ালের মধ্যে আটকে আছি। চল্লিশ বছর ধরে আমি আমার মায়ের মুখ দেখতে পাইনি। চল্লিশ বছর ধরে আমি এই অন্ধকারে অপেক্ষা করছি। আর আপনি বলছেন, দুঃখিত?"

সুড়ঙ্গের দেওয়াল কাঁপতে লাগলো । মেঝে থেকে জল উঠতে শুরু করলো। পুকুরের কালো জল যেন মাটির ভিতর দিয়ে ঢুকে আসছে। কুসুমের চোখ থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়লো।

তারপর কুসুম আবার বললো  , "আজ আমার অপেক্ষা শেষ হবে।"

সে অনুব্রত হাত ধরল। সেই স্পর্শে অনুব্রতর  শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেলো। তার চোখের সামনে দৃশ্য বদলে গেলো। সে এখন দশ বছরের শিশু। তার সামনে কাঠের দরজা। দরজার ওপাশে কুসুম কাঁদছে।

কুসুম কাদতে কাদতে বলছে , "দরজা খোলো!"

ছোট্ট অনুব্রত কাঁদতে কাঁদতে চাবি খুঁজছে। কিন্তু চাবি নেই।

তারপর দরজার ওপাশ থেকে আর কোনো শব্দ আসে না।

শুধু নখ দিয়ে কাঠ আঁচড়ানোর শব্দ।

তারপর ধীরে ধীরে সেই শব্দ ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে যায় । শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ নীরবতা।

অনুব্রত চিৎকার করে উঠল।

"না!"

সে চোখ খুলল। সে আবার সুড়ঙ্গের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে।

কুসুম তার সামনে।

কুসুম বললো  , "এবার মনে পড়েছে?"

অনুব্রত হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

অনুব্রত  বললো  "আমি দুঃখিত... আমাকে ক্ষমা করে দাও ।"

কুসুমের চোখে জল এলো । সেই জল মাটিতে পড়তেই ছোট্ট লাল ফুল হয়ে ফুটে উঠল।

কুসুম বললো  , "আমিও তো তোমাকে দোষ দিই নি, অনুব্রত।"

সে মৃদু গলায় বললো , "আমি শুধু চাই, তুমি সত্যিটা জানো।"

তারপর কুসুমের শরীর ধীরে ধীরে স্বচ্ছ হয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে লাগলো ।

অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে যাওয়ার আগে সে একবার মৃণালিনী দেবীর দিকে তাকালো।

"এবার আপনিও আসুন।"

মৃণালিনী চোখ বন্ধ করলো।

তারপর মৃণালিনী বললো  "আমি প্রস্তুত।"

এক মুহূর্তের জন্য সুড়ঙ্গের মধ্যে আলো জ্বলে উঠল। তারপর সব অন্ধকার।

 

পরদিন সকালে ইন্সপেক্টর অনিকেতের জ্ঞান ফিরল জমিদারবাড়ির উঠোনে। অনুব্রত তাঁর পাশে পড়ে ছিল।

নিবারণ নেই। মৃণালিনী নেই। সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ বন্ধ  আর তেরো নম্বর ঘরের দরজা আবার তালাবন্ধ।

পুলিশ পুরো বাড়ি তল্লাশি করলো। কোথাও কোনো মৃতদেহ পাওয়া গেলো না।

কুসুমের হাড়গুলোও উধাও।

শুধু ভূগর্ভস্থ ঘরের মেঝেতে পড়ে ছিল একটি পুরোনো ডায়েরি।

তার শেষ পাতায় লেখা— 'আজ আমার ছেলে ফিরে এসেছে।

আমি জানি, সে আমাকে ক্ষমা করবে না। আমি জানি, আমারও অপরাধ ছিল।

আমি কুসুমকে বাঁচাতে পারিনি। আমি আমার ছেলেকেও বাঁচাতে পারিনি।

কিন্তু আজ এত বছর পর আমি বুঝেছি, কিছু দরজা বাইরে থেকে বন্ধ হয় না। কিছু দরজা বন্ধ হয়ে যায় মানুষের নিজের ভয়ের কারণে। আর সেই দরজা খুলতে গেলে প্রথমে নিজের ভিতরের অন্ধকারের মুখোমুখি হতে হয়।'

ইন্সপেক্টর অনিকেত ডায়েরিটা অনুব্রতর হাতে দিলো।

ইন্সপেক্টর অনিকেত জিজ্ঞাসা করলো ­­, "আপনার মা কোথায় গেলেন?"

অনুব্রত উত্তর দিতে পারল না। তার মনে হচ্ছিল, গত রাতের সমস্ত ঘটনা হয়তো কোনো দুঃস্বপ্ন।

হয়তো ক্লান্তি। হয়তো অপরাধবোধ থেকে তৈরি হওয়া বিভ্রম  কিন্তু তার ডান হাতের কবজিতে একটা লাল দাগ ছিল। যেন কেউ বরফের মতো ঠান্ডা আঙুল দিয়ে তাকে শক্ত করে ধরেছিলো।

 

তিন দিন পরে পুলিশ হরিপদ মিত্র , সুকান্ত এবং ড. অর্ণব সেন এর মৃত্যুর তদন্ত শেষ করলো।

সরকারি রিপোর্টে লেখা হলো, হরিপদ মিত্র ও সুকান্তর মৃত্যু সন্দেহজনক। ড. অর্ণব সেন এর মৃত্যুর কারণ নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায়নি। অপরাধী শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

তেরো নম্বর ঘর সিল করে দেওয়া হলো। অনুব্রত বাড়ি বিক্রি করে আবার কলকাতায় ফিরে গেলো। কিন্তু যাওয়ার আগে সে একবার শেষবারের মতো করিডরে দাঁড়িয়েছিল। দরজার সামনে। তেরো নম্বর ঘর। সে দরজায় হাত রাখল। ভিতর থেকে কোনো শব্দ এলো না।

শুধু মনে হলো দরজার ওপাশে যেন কেউ খুব ধীরে ধীরে হাঁটছিলো।

এক পা।

দু পা।

তিন পা।

তারপর থেমে গেলো। অনুব্রত আর পিছনে ফিরে তাকায়নি।